এই সময়, কাঁথি ও খড়্গপুর: দুই জেলার একাধিক কেন্দ্রে ঘুরে বেড়ালেন। কোথাও নানা ইস্যুতে আক্রমণ করলেন তৃণমূলকে। কোথাও বিজেপি সরকার এলে কী কী উন্নয়ন হবে তার তালিকা তুলে ধরে সোমবার প্রচার সারলেন নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের বিরোধীা দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এদিন তাঁর মতোই দুই জেলায় পদ্মপ্রার্থীদের হয়ে সভা করেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা। সবারই আক্রমণের লক্ষ্য ছিল তৃণমূল।
এদিন উত্তর কাঁথি, রামনগর ও দক্ষিণ কাঁথি বিধানসভার বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে সভা ও পদযাত্রায় যোগ দেন শুভেন্দু। উত্তর কাঁথির দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে দহসোনামুই এলাকায় সভায় শুভেন্দু হুঁশিয়ারি দেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে উত্তর কাঁথির তৃণমূল দেবাশিষ ভুঁইয়া ও দক্ষিণ কাঁথির তৃণমূল প্রার্থী তরুণ জানার অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করে বলেন, ‘মমতা মিথ্যা কথা বলেন। পাশের রাজ্য ওড়িশায় তো মাছ খাওয়া বন্ধ হয়নি। উনি সারা জীবনেও একটা সত্যি কথা বলেননি । বিজেপিকে ক্ষমতায় অানুন। প্রধানমন্ত্রী যেমন কথা দিয়েছেন সেই ভাবেই কাজ হবে। তৃণমূল গুন্ডামি করলে কেন্দ্রীয় বাহিনী কোমর ভেঙে দেবে। আপনারা নিশ্চিত থাকুন রাজ্যে পরিবর্তন আসছে।’ রামনগরের সভায় শুভেন্দু বলেন, ‘মমতা বন্দ্যেপাধ্যায় চাকরি দিতে পারেননি। ভাতা দিচ্ছেন। রাজ্যের মানুষ কাজ পাচ্ছেন না। তাই পরিযায়ী শ্রমিকরা তৃণমূলকে হারাতে ভোট দিতে আসছেন। এ রাজ্যে মহিলাদের কোনও সম্মান নেই। তাই অভয়ার মা তৃণমূলের বিরুদ্ধে নেমেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’
সবংয়ের বিজেপি প্রার্থী অমল পান্ডার সমর্থনে সবংয়ের লাঙলকাটায় নির্বাচনী জনসভা করেন শুভেন্দু। সেখানে বলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলেই এক বছরের মধ্যে কাঁটাখালিতে সেতু নির্মাণ করা হবে।’ পাশাপাশি সবংয়ের তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়ার সঙ্গে চিটফান্ডের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সবংয়ের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে কেলেঘাই নদী। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলার সবংয়ের সঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভগবানপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার জন্য কাঁটাখালিতে কেলেঘাইয়ের উপরে পাকা সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। সবংয়ে সভা থেকে ফের সেই ইস্যুকে উস্কে দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘বন্ধু কাঁটাখালির ব্রিজ আর কবে হবে?’ পরে নিজেই বলেন, ‘বিজেপি সরকার এলে এক বছরের মধ্যে কাঁটাখালিতে সেতু হবে।’ মানসকে আক্রমণ করে শুভেন্দু বলেন, ‘আপনাকে সিবিআই, ইডি কতবার ডেকেছিল আমরা জানি। আপনার সঙ্গে চিটফান্ডের কী সম্পর্ক আমরা জানি। বেশি ঘাটাবেন না।’ এই নিয়ে ঘাটাল সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতি অজিত মাইতি বলেন, ‘আমি ব্যক্তি আক্রমণ পছন্দ করি না। মানুষ এ সবের জবাব দেবেন। আমি বলে রাখছি, বড় ব্যবধানে জিতবেন মানস ভুঁইয়া।’
যোগীর মুখে মাছ ও বুলডোজার
এই সময়, খড়্গপুর ও গড়বেতা: যোগীর মুখেও মাছের কথা! বিজেপি ক্ষমতায় এলে চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন জানানোর পাশাপাশি মাছ উৎপাদনেও জোর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। সোমবার পিংলা বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী স্বাগতা মান্নার সমর্থনে খড়্গপুর গ্রামীণের গোকুলপুরে জনসভা করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তৃণমূলকে আক্রমণ করে যোগী বলেন, ‘বাংলার জমি উর্বর। কিন্তু এক সময় কংগ্রেস, বামপন্থী ও শেষ পনেরো বছরে তৃণমূল বাংলাকে কাঙাল বানিয়েছে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত। চাষিরা আলুর দাম পাচ্ছেন না। ধানের দামও কমে চলেছে। মাছ উৎপাদনও কমছে। তৃণমূলে স্বজনপোষণ আর দুর্নীতি চলছে।’ রাজ্যে গুন্ডাগিরি নিয়ে বুলডোজারের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘এখানে বালি মাফিয়া, জমি মাফিয়া, গরু মাফিয়ারা বাংলাকে চুষে চলেছে। উত্তরপ্রদেশেও আগে হতো। ডবল ইঞ্জিন সরকার হওয়ার পর কোনও দাঙ্গা নেই। কারণ, মাফিয়া রাজ দেখলেই বুলডোজার চলে।’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘মমতা দিদি বলেছেন খেলা হবে। আমি বলছি, এ বার খেলা বন্ধ হবে। খেলা শেষ। উন্নয়ন শুরু।’ এদিন গড়বেতার সভাতেও যোগীর গলায় ছিল এক সুর। বলেন, ‘তৃণমূলের সরকার তুষ্টি করণের রাজনীতি করছে।’ ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘যদি রাজ্যে পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।’ এ দিন দুই জায়গাতেই দেখতে ও সভায় ভিড় ছিল চোখে পরার মতো।
পিংলার তৃণমূল প্রার্থী অজিত মাইতির পাল্টা জবাব, ‘'কেউ সভা করতেই পারেন। তবে মানুষের সাড়া মেলেনি। ডেবরা, সবং থেকে লোক আনতে হয়েছে। আর অনুরোধ করব অসত্য কথা না বলতে। অকারণ, রাজনৈতিক বৈরিতা তৈরি হবে।’
‘দুর্নীতির সরকার’, তোপ নীতিন নবীনের
এই সময়, হলদিয়া: ‘বাংলায় চলছে দুর্নীতির সরকার’। সোমবার সুতাহাটার দ্বারিবেড়িয়া জনসভায় রাজ্যে পালা বদলের ডাক দিয়ে এ ভাবেই তৃণমূলকে আক্রমণ করলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। বিজেপি শাসন ক্ষমতায় এলে রাজ্যে ঢালাও উন্নয়ন হবে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার মা মাটি মানুষের কথা বললেও বাস্তবে মানুষের কোনও কাজ হয়নি। হয়েছে সিন্ডিকেটরাজ, তৃণমূল নেতাদের আখের গোছানোর রাজনীতি।’ মহিষাদলের বিজেপি প্রার্থী সুভাষচন্দ্র পাঁজাকে ভোট দিয়ে বিজেপির হাত শক্ত করার জন্য ডাক দেন তিনি। যদিও তাতে রাজ্যের মানুষ সাড়া দেবেন না বলে দাবি তৃণমূলের। তমলুক সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজিত রায়বলেন, ‘মানুষ বিজেপির ধাপ্পাবাজি আর তৃণমূলের উন্নয়ন দুটোকেই পরিষ্কার বুঝে নিয়েছেন। দিল্লি থেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে নরেন্দ্র মোদী, অমিত সাহা, নীতিন নবীনরা যতই লম্পঝম্প করুন, বাংলায় চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’ এ দিন এগরার বিজেপি প্রার্থী দিব্যেন্দু অধিকারীর সমর্থনে রোডশো করেন নবীন।
এ বার না হলে আর পারব না, হেমন্ত বিশ্বশর্মা
এই সময়, তমলুক: তমলুক বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী হরেকৃষ্ণ বেরার সমর্থনে সভায় এসে বাংলায় শিক্ষকদের চাকরি দুর্নীতি প্রসঙ্গে তৃণমূলকে বিঁধলেন অসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মা। বলেন, ‘এ রাজ্যে শিক্ষকের চাকরি পাওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা দিতে হয়। নেতাদের বাড়ি থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হয়। অসমে ২ লক্ষ যুবককে চাকরি দিয়েছি, এক টাকাও লাগেনি।’ বিজেপি এলে মাছ–মাংস খাওয়া যাবে বলে তৃণমূলের প্রচার নিয়ে হেমন্ত বলেন, ‘অসমে মাছ–মাংস খাওয়া বন্ধ হয়নি। আমি দিদিকে বলব হয় উনি আমার বাড়িতে আসুন, নয়তো আমি ওঁর বাড়িতে যাব। টেবিলে বসে এক সঙ্গে মাছ খাওয়া শুরু করব।’ তিনি বলেন, ‘এখানে হুমায়ুন বলছে বাবরি মসজিদ বানানোর কথা। এ কথা অসমে বললে দু’ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিয়ে নিতাম।’ বিজেপি প্রার্থীকে জেতানোর ডাক দিয়ে হেমন্ত বলেন, ‘৪ মে বাংলার মুক্তির দিন। তারপর বিজেপি সরকার গড়বে। অসমে সেঞ্চুরি, বাংলায় ডবল সেঞ্চুরি।’ সবশেষে সবার উদ্দেশে অনুরোধ করে বলেন, ‘এ বার আমরা যদি সরকার না বানাতে পারি, তাহলে আর কখনওই বানাতে পারব না।’