আত্মঘাতী বাঙালি কোনও কিছু বেশি দিন মনে রাখে না! ফলে এ বারের বিধানসভা ভোটে সাগরদিঘি আসনে তৃণমূলের প্রার্থী বাইরন বিশ্বাসের প্রচারে উপচে পড়া ভিড়। ভোট প্রচারে বের হলে মানুষের ঢল নামছে। কিন্তু ২০২৩-এ সাগরদিঘি উপ-নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেস প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস দলবদল করে শাসক দলে যোগ দেওয়ায় সাগরদিঘির মানুষের আবেগে ধাক্কা লেগেছিল। তাঁদের ভোটে জয়লাভ করার তিন মাসের মধ্যে সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থীর দল ত্যাগ ভোটাররা মানতে পারেননি। সেই সময়ে সাগরদিঘিবাসী 'মীরজাফর' বলতেও কসুর করেননি তাঁকে। কিন্তু তিন বছর পরে সে সব মনে রাখেননি সাগরদিঘির মানুষ। ফলস্বরূপ, ভোট প্রচারে পিলপিল করে প্রতি দিন ভিড় বাড়ছে।
সাগরদিঘি আসন বরাবর সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা ছ'বার সিপিএমের প্রার্থী জয়ী হন ওই আসন থেকে। প্রথম ২০১১ সালে তৃণমূলের সুব্রত সাহা ওই আসনে ভোটে দাঁড়িয়ে 'ব্রেক' করেন। এর পরে টানা তিন বার সুব্রত ওই আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে ২০২৩-এ সাগরদিঘি আসনে উপ-নির্বাচনে পেশায় বিড়ি ব্যবসায়ী বাইরন হাত প্রতীক চিহ্ন নিয়ে প্রথম বার দাঁড়িয়ে বাজিমাত করেন। তবে কংগ্রেসের একমাত্র সদস্য হিসেবে নবান্নে পা রাখার তিন মাসের মধ্যে ভোল বদল করে বাইরন হাতে জোড়াফুলের পতাকা তুলে নেন। বাকি সময় তৃণমূলের বিধায়ক হিসেবে মেয়াদ উতরে দিয়ে এ বার তিনি তৃণমূলের জোড়া ফুল প্রতীকের প্রার্থী। এ বারের বিধানসভা ভোটে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কংগ্রেসের মনোজ চক্রবর্তী।
অন্যদিকে, সাগরদিঘি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তৃণমূলের মসিউর রহমান এ বারের ভোটে বড় 'ফ্যাক্টর'। কারণ তৃণমূল ছেড়ে সম্প্রতি তিনি এসডিপিআই দলে যোগ দিয়ে আইএসএফের প্রতীকে প্রার্থী হয়ে মনোনোয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমা করার দিন-ই দলবিরোধী কাজের জন্য রাজ্য তৃণমূল নেতৃত্বের নির্দেশে মসিউর রহমানকে সাসপেন্ড করে তৃণমূলের জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা নেতৃত্ব। এ বারের বিধানসভা ভোটে ISF-র জোট সঙ্গী হিসেবে সিপিএম মসিউরকে সমর্থন করেছে। ফলে সিপিএম-আইএসএফ-এসডিপি আই তিন দলের সমর্থন পাবেন মসিউর। আর ওই আসনে বিজেপি প্রার্থী করেছে তাপস চক্রবর্তীকে।
এর আগে ২০২৩-র উপ-নির্বাচনে বাইরন ভোট পেয়েছিলেন ৮৭ হাজার ৬৬৭টি, তৃণমূলের দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ৬৪ হাজার ৬৮১টি এবং বিজেপি'র দিলীপ সাহা ২৫ হাজার ৮১৫টি ভোট পেয়েছিলেন। এ দিকে, 'দলবদলু' বলে বাইরনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস যে প্রচার তুঙ্গে তুলবে, তা হচ্ছে না। কারণ দলের অন্দরে মনোজকে ঘিরে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।
প্রাক্তন ওই বিধায়ক তথা মন্ত্রী মনোজকে কংগ্রেস প্রার্থী ঘোষণার পরেই সাগরদিঘির গৌরীপুর মাঠে স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন এবং ওই বৈঠকে দাবি ওঠে— অবিলম্বে মনোজ চক্রবর্তী'র প্রার্থিপদ পরিবর্তন করার। তারও আগে সাগরদিঘি ব্লক কংগ্রেস কার্যালয়ে মনোজ চক্রবর্তীকে দলীয় নেতা-কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। স্থানীয় কর্মীদের একটা বড় অংশ বহরমপুরের বাসিন্দা মনোজ চক্রবর্তীকে ‘বহিরাগত’ বলে বিরোধিতা করছেন। তাঁদের দাবি, সাগরদিঘি কেন্দ্রের জন্য স্থানীয় কোনও ‘ভূমিপুত্র’কে প্রার্থী করা হোক। ফলে শুরু থেকেই মনোজকে ঘিরে সাগরদিঘিতে অসন্তোষের একটা চোরা স্রোত বইছে।
দীর্ঘ দিনের রাজনীতিবিদ প্রবীণ মনোজ চক্রবর্তী ওই ক্ষোভকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘মান-অভিমান যা ছিল সব দূর হয়ে গিয়েছে। আর মঙ্গলবার সাগরদিঘি'র সভা থেকে অধীর চৌধুরী প্রচারের ঝড় বইয়ে দিয়েছেন। সেই ঝড়ে বিরোধীরা লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে আর কংগ্রেসীরা একজোট হয়েছে। ওই সভার ভিড় বলে দিয়েছে, মানুষ এ বারের ভোটে কোন দিকে রয়েছেন।’
এ দিকে, এসডিপিআই-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেই দলের প্রার্থীকে কী করে সিপিএম সমর্থন করলো, তা নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন উঠছে। সাগরদিঘিতে প্রার্থী না দিয়ে সিপিএম মসিউরকে সমর্থন করায় বাম-শরিক দলগুলি তাঁদের ভোট স্যুইং করাবে কিনা, তাও দেখার।
মসিউর বলেন, ‘সাগরদিঘির মানুষ বলিয়ে-কইয়ে বিধায়ক চান। যাঁদের কথা বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলতে পারবে। গত তিন বছরে এলাকার মানুষের কথা বিধানসভায় দাঁড়িয়ে যিনি বলতে পারেন না, তিনি কেমন বিধায়ক! এ বারের ভোটে মানুষ তাঁকে ত্যাগ করবে।’
এখন বাইরনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ, মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক মেলামেশা করার ক্ষেত্রে তাঁর বড্ড অনীহা রয়েছে। নিজের জগতে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে নিয়ে থাকতে ভালবাসেন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মানুষের বড় ক্ষোভ--কাবিলপুর এলাকার প্রায় ১০কিমি‘র বেশি রাস্তা দীর্ঘ দিন সংস্কার না করা। যদিও ভোটের আগে কাবিলপুর, গোবর্ধনডাঙা ও মোরগ্রামের রাস্তা সংস্কার শুরু হয়েছে। এতে কিছুটা হলেও গ্রামবাসীদের ক্ষোভ কমবে বলে বিশ্বাস তৃণমূল নেতৃত্বের।
বাইরন বলেন,‘বিধায়ক হলে সাগরদিঘিতে একটা আধুনিক স্টেডিয়াম ও মাদার চাইল্ড হাব নির্মাণ করা হবে। এলাকায় দমকল দপ্তর এবং ৯০০ বিঘার সাগরদিঘির পাড় সৌন্দর্যায়ন করা হবে। এতে মানুষের কর্মসংস্থানও হবে।‘
বিজেপি'র জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুবলচন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী অসিত চক্রবর্তী সাগরদিঘি আসনে একটা ফ্যাক্টর। ওই আসনে ৪০% হিন্দু ভোট রয়েছে। তার মধ্যে ২৫% আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। ওই আদিবাসী ভাইবোনদের জন্য বিধায়ক কিছু করেননি। এলাকায় কোনও উন্নয়ন হয়নি। সেই সঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক মহিলা কর্মাধ্যক্ষকে অপমান করে তৃণমূলের এক নেতা। ভোট দেওয়ার সময়ে মানুষ এ সব মনে রাখবেন।’
SIR-এ নাম বাদ যাওয়ার পরে এ বার সাগরদিঘি বিধানসভায় ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ১৭ হাজারের কাছাকাছি। এখন এসডিপিআই এবং বিজেপি প্রার্থীর জেতার ক্ষেত্রে তাঁদের দুর্বল সংগঠন মস্ত বড় বাধা। সে দিক থেকে টক্কর হবে বাইরন বনাম মনোজ। শেষ পর্যন্ত নবীন নাকি প্রবীণ— কে বাজিমাত করবে, এখন সেটাই দেখার!