• রেজিনগরে জোর লড়াই আতাউর বনাম হুমায়ুনের, কতটা ফ্যাক্টর বিজেপি -কংগ্রেস?
    এই সময় | ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৬-এ বিশেষ নজরে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর। তৃণমূলের প্রার্থী বদল থেকে নতুন দল খুলে রেজিনগরের ময়দানে হুমায়ুনের এন্ট্রি, এ বার এই কেন্দ্রের লড়াইকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। নির্বাচনের দামামা বাজার পর থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে এই কেন্দ্রে। লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই পদ্ম প্রার্থী ও হাত শিবিরও। রেজিনগর বিধানসভা আসন থেকে ৬৮ হাজার ২৬৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন ২০২১ সালের তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। এ বারের বিধানসভা ভোটে 'কৌশলগত' কারণে সেই রবিউলকে রেজিনগর থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে প্রার্থী করা হয়েছে বেলডাঙায়। তাঁর বদলে রেজিনগর আসনে এ বার তৃণমূলের ভরসা আতাউর রহমান, যাঁর স্ত্রী বিউটি বেগম আবার বেলডাঙা-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি।

    ওই আসনে এ বার প্রার্থী হয়েছেন তৃণমূলের সাসপেন্ডেড বিদায়ী বিধায়ক তথা আম জনতা উন্নয়ন দলের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষ আর কংগ্রেস দাঁড় করিয়েছে জিল্লুর শেখকে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আতাউর বনাম হুমায়ুনে।

    ভাগীরথীর পূর্ব পাড় বেলডাঙা-১ ব্লকের বেগুনবাড়ি, কাপাসডাঙা ও মির্জাপুর তিনটি পঞ্চায়েত ও ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ের বেলডাঙা-২ ব্লকের ১১টি পঞ্চায়েত মিলিয়ে ১৪টি পঞ্চায়েত এলাকা রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত।

    গত বিধানসভা ভোটে রবিউল আলম চৌধুরী ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৯৪টি ভোট পেয়েছিলেন। বিজেপি’র অরবিন্দ বিশ্বাস পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ২২৬টি ভোট ও কংগ্রেস প্রার্থী কাফিরুদ্দিন শেখ ৩৭ হাজার ২৮২ ভোট পেয়েছিলেন। আর গত বিধানসভা ভোটে হুমায়ুন প্রার্থী হয়েছিলেন ভরতপুর বিধানসভা থেকে। কিন্তু ২০১৬-তে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে রবিউল ইসলাম ইসলাম (৭৯,৭৭০ ভোট)-এর কাছে ৫৫৬০ ভোটে হার মানতে হয়েছিল নির্দল প্রার্থী হুমায়ুন কবীর (৭৪,২১০)-কে। আর সেই সময়ে তৃণমূলের সিদ্দিকা বেগম পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ৬৩১টি ভোট। তার আগে ২০১১ সালে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে হুমায়ুন কবীর (৭৭, ৫৪২) পরাজিত করেছিলেন আরএসপি'র সিরাজুল ইসলাম মণ্ডল (৬৮,৭৮১)-কে।

    এখন বিধায়ক থাকাকালীন রবিউল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে আতাউর রহমানের 'সম্পর্ক' ছিল অম্ল-মধুর। কিন্তু ভোট বড় বালাই! ফলে প্রার্থী হওয়ার পরে আতাউর রহমান প্রথম যে কাজটি করেন, সেটা হলো বিদায়ী বিধায়কের বাড়িতে গিয়ে সমস্যার মীমাংসা করেন তিনি। তার ফলে এখন রেজিনগর বিধানসভা আসনে রবিউলের অনুগামী লোকজনকে আতাউরের সঙ্গে ভোট প্রচারে দেখা যাচ্ছে।

    দলীয় প্রার্থী নিয়ে শুরুর দিকে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বে মধ্যেও ক্ষোভ ছিল। ওই এলাকায় ৩৫% হিন্দু ভোট রয়েছে। ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ের ১১টি পঞ্চায়েতের মধ্যে সাতটি পঞ্চায়েত এলাকায় বিজেপি ভোট একটা বড় 'ফ্যাক্টর'। গত লোকসভা ভোটের নিরিখে রেজিনগর আসনে ভালো ভোট পেয়েছিল। যদিও SIR-এ নাম বাদ পড়েছে প্রায় ৫৫ হাজারের কাছাকাছি। ফলে, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের একটা ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভোট বাক্সে সমর্থন নিজেদের দিকে টানতে চেষ্টা করছে সব রাজনৈতিক দল ।

    সেই সঙ্গে রামনগর থেকে কর্ণসুবর্ণ হয়ে উত্তরপাড়া ছুঁয়ে বহরমপুর যাওয়ার ২৫ কিমি প্রধান রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। ওই রাস্তার বিশেষ করে রামনগর ঘাট থেকে কর্ণসুবর্ণ পর্যন্ত ২০ কিমি রাস্তা ভাঙাচোরা। পিচের চাদর সরে গিয়ে রাস্তার কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় জল জমে পুকুরে পরিণত হয়। ওই পথে যাতায়াত করা চরম সমস্যা হয়ে উঠেছে। সে কথা মানছেন বেলডাঙা-২ পশ্চিম ব্লক তৃণমূলের সভাপতি সন্দীপ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘পূর্ত দপ্তরের ওই রাস্তা সারানোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ভোটের আগে তা সম্ভব নয়। ভোট মিটলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ওই রাস্তা সারানো হবে।’ ওই রাস্তা সংস্কার বিদায়ী বিধায়কের দায়িত্ব ছিল বলে মনে করেন এলাকাবাসী। কিন্তু সে কাজ তিনি করেননি। ফলে রবিউলের উপরে জমে থাকা ক্ষোভ কমানোর ভার এখন আতাউরকে বহন করতে হচ্ছে।

    আতাউর বলেন,‘ভোট প্রচারে বেরিয়ে আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারি প্রকল্পের কাজের খতিয়ান তুলে ধরছি। সেই সঙ্গে রেজিনগর শিল্পতালুককে ঘিরে শিল্প গড়ে তোলার কথা বলছি। আর এলাকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কথা বলছি।’

    অন্য দিকে, হুমায়ুনের ভরসা বাবরি মসজিদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগ। ওই আবেগের সঙ্গে তীব্র তৃণমূল বিরোধিতাকে সঙ্গী করে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু, সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিয়ো বিতর্কে খানিক ধাক্কা খেয়েছেন হুমায়ুন বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

    বিজেপি ও কংগ্রেস সাংগঠনিক দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। ফলে, ‘টক্কর’ যা হওয়ার আতাউর ও হুমায়ুনের মধ্যেই হবে। এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহলে। তবে, ভোটারদের একটা অংশ নীরব রয়েছেন। আর ভোটের আগে এতটা শান্ত এলাকা কখনও ছিল না। এটা ঝড়ের আগের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে চিন্তিত এলাকার মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটের আগের রাতে বা ভোটগ্রহণের দিন হিংসার রাজনীতি না হলে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছেন শাসক দলের প্রার্থী। তবে, ৪৩ বছরের রাজনীতি জীবনের অভিজ্ঞতায় ম্যাচ বের করতে হয় কী ভাবে, তা অজানা নয় হুমায়ুনের!

    এখন প্রথম বার ভোটে দাঁড়িয়ে বাজিমাত করবেন আতাউর নাকি বাবরি আবেগের সঙ্গে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মিশেলে 'গড়' রেজিনগর ফের নিজের দখলে নিয়ে আসবেন হুমায়ুন! অপেক্ষার প্রহর গুনছে রেজিনগরবাসী!

  • Link to this news (এই সময়)