এই সময়: তাঁর বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরের তিনটি ওয়ার্ডে ছাপ্পা দেওয়ার ছক তৈরি হয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী তাঁর নির্বাচনী প্রচারও ব্যান করা হতে পারে বলে তৃণমূলনেত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি, যদি নির্বাচন কমিশন তাঁর প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তা হলে বাড়িতে বসে তিনি সত্যাগ্রহ করবেন।
ভবানীপুরে তাঁর মনোনয়ন আটকানোর চেষ্টা করেছে বিজেপি— এই অভিযোগ আগেই তুলেছিলেন তৃণমূলনেত্রী। তবে প্রথম দফার ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে মমতা নিজের কেন্দ্রে ছাপ্পা দেওয়া, এমনকী তাঁর প্রচার ব্যান করার যে অভিযোগ তুলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরাসরি কারও নাম না–করলেও বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকেই তিনি নিশানা করতে চেয়েছেন বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত কলিন্স লেনে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি না–থাকলেও দলনেত্রীর প্রচার কর্মসূচির অনুমতি নির্বাচন কমিশন দেয়নি বলে অভিযোগ জোড়াফুলের। কমিশনের সিদ্ধান্ত দেখেই মমতার আশঙ্কা, তাঁর নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। ২০২১–এর বিধানসভা ভোটে মমতার প্রচার কমিশন ২৪ ঘণ্টার জন্য ব্যান করেছিল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ২০২৬–এর ভোটেও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূলনেত্রী। প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা এবং তিনটি ওয়ার্ডে ছাপ্পা দেওয়ার ছক একসূত্রে বাঁধা বলে তৃণমূলে সর্বোচ্চ নেতৃত্বও মনে করছেন।
উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দলে তৃণমূলের নির্বাচনী সভায় মঙ্গলবার মমতা বলেন, ‘আমার বিধানসভার তিনটি ওয়ার্ড বেছে নিয়েছে— ৭৪, ৭৭ ও ৬৩ নম্বর। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে ছাপ্পা করাবে। আমিও ধাপ্পা দেবো, তখন বুঝবে ঠেলা। বিছুটিপাতার ঝোল খাওয়াব। তুমি আমাকে চেনো না। যেখানে তুমি গন্ডগোল করবে, আমি গিয়ে হাজির হব। তুমি আটকাও আমাকে।’ এরপরেই তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ সংযোজন, ‘আমাকে তুমি ব্যান করবে? আমাকে ব্যান করলে সারা ভারত আমাকে দেখবে। আমি ঘরে বসে সত্যাগ্রহ করব। আমার বাড়ির বারান্দায় বসে থাকব। সারা দেশ তোলপাড় হবে। সারা বিশ্ব তোলপাড় হবে।’
জেলায় জেলায় ভোট প্রচার সেরে সোমবার মমতা ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ছোট সভা করেন। এই ওয়ার্ডের বহুতলের আবাসিকদের সঙ্গেও ঘরোয়া আলাপচারিতা সারেন তিনি। মমতার সঙ্গে এই জনসংযোগ কর্মসূচিতে ফিরহাদ হাকিম, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়–সহ জোড়াফুলের অন্য নেতারা ছিলেন। মঙ্গলবারও উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোয় নির্বাচনী সভা সেরে মমতা ভবানীপুরে ফিরে ঘরোয়া জনসংযোগ করেছেন। কিন্তু কলিন্স লেনে প্রচার কর্মসূচির অনুমতি না মেলায় ক্ষুব্ধ মমতা এ দিন বলেন, ‘গদ্দারের লোককে রিটার্নিং অফিসার করেছে! সে বলছে অনুমতি দেবো না। নির্বাচনের পরে দেখব, বিজেপি তোমাকে রাজ্যপাল করে, নাকি রাষ্ট্রপতি করে! তুমি থাকো তো বারুইপুরে! তোমাকে আমরাই বিডিও বানিয়েছিলাম। রিটার্নিং অফিসার হওয়ার যোগ্যতা নেই তোমার।’ যদিও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল স্পষ্ট বলেন, ‘এই সভার জন্য কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। সুবিধা অ্যাপে অনলাইনে প্রথমে অনুমতি চেয়ে তারপরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। লিখিত ভাবে অফলাইনে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। কারণ, অফলাইনে কোনও সভার অনুমতি দেওয়া হয় না। অনলাইনেই আবেদন করতে হবে।’
তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, দলনেত্রীর কাছে নির্দিষ্ট কোনও ইনপুট আসার ফলেই তিনি এ দিন তিনটি ওয়ার্ডে ছাপ্পা ভোট দেওয়ার ছক ফাঁস করে দিয়েছেন। ভবানীপুরে আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডে মিশ্র ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। ২০২৪–এর লোকসভা ভোটে এই ওয়ার্ডে পদ্মফুল ভালো ভোট পেয়েছিল। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে সংখ্যালঘু জনতার বসবাস আছে। এই ওয়ার্ড থেকে তৃণমূল সব সময়ে বড় লিড নেয়। জোড়াফুল শিবিরের বক্তব্য, এই সমীকরণের ভিত্তিতেই তিনটি ওয়ার্ডকে টার্গেট করা হয়েছে এবং সেই ছক দলনেত্রীর কানেও এসেছে। মমতার এই অভিযোগ নিয়ে এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী তথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ছাপ্পার ছককে মোকাবিলা করার রোড–ম্যাপও ঘোষণা করেছেন মমতা। সরাসরি কমিশন বা বিজেপির নাম না–করে তিনি এ দিন বলেছেন, ‘ওরা বলছে ইভিএম লুট করবে। মনে রাখবেন, আমরা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই করে বেঁচে থাকি। দখল করা অত সহজ নয়। মানুষের ভোট লুট করলে মানুষ পাল্টা দেবে।’
ভবানীপুরের কোনও জায়গায় যদি আনুষ্ঠানিক জনসভা করার অনুমতি না দেওয়া হয়, তা হলে তিনি কী ভাবে জনসংযোগ করবেন, তাও শুনিয়েছেন মমতা। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘তুমি অনুমতি না দিয়ে আমাকে আটকাবে? আমি যে কোনও এলাকায় গিয়ে প্রার্থী হিসেবে আমি চা তো খেতে পারি। তুমি আমার চা খাওয়া বন্ধ করো তো, সাহস থাকলে দেখব! আমার মিটিং করার দরকার নেই। আমি একটা এলাকায় গিয়ে বসলেই সবাই চলে আসবে।’ জোড়াসাঁকোর সভা শেষ করে মমতা ভবানীপুরে ফিরেই হাতে চায়ের কাপ নিয়ে এ দিন জনসংযোগ সেরেছেন।