মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারায় অভিযোগ করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট অর্থাৎ ED। এ দিকে কেন্দ্রীয় সংস্থার সেই অভিযোগ করার কোনও এক্তিয়ারই নেই বলে, সু্প্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি। পাশাপাশি রাজ্যের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর দাবি,‘সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, রাষ্ট্রের নিজের জন্য নয়।’ এ প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মৌলিক অধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া ধারণার বিরুদ্ধে যাচ্ছে এই মামলা। পর্যবেক্ষণে বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্রের বলেন, ‘গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলতে পারেন না কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।’
বুধবার বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র ও বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চে ইডির দায়ের করা মামলার বৈধতা নিয়ে চলে বিস্তারিত শুনানি। মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার পাল্টা দাবি, মামলা তাদের পক্ষে না যাওয়ায় খারিজের চেষ্টা করছে রাজ্য। শুনানির শুরু থেকেই সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ তুলে ধরে ইডির এক্তিয়ার এবং মৌলিক অধিকারের সীমা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন তিনি। এদিন আদালতে দাঁড়িয়ে রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজির হয়ে সওয়ালে আইনজীবী সিংভি দাবি করেন, কিছু অধিকার কোনও কোম্পানি বা সংস্থার জন্য নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তির জন্য। তাঁর কথায়, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪, ২১,২২ প্রয়োগ করছে ইডি৷ কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসাবে ইডির সেই ক্ষমতা নেই। এটা স্পষ্ট যে, আপনি প্রত্যক্ষ ভাবে এই কাজ করতে পারেন না। এখানে অফিসারের আলাদা কোনও ভূমিকা নেই৷ ফলে আপনি যা সরাসরি করতে পারেন না, তা ঘুরপথেও করতে পারবেন না।’ অর্থাৎ দপ্তরের হয়ে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে পিটিশন দায়ের করেছে এই ধারায় মামলা গ্রহণযোগ্য নয় বলে ফের দাবি করেন সিংভি।
এই সওয়াল শুনে বিচারপতি মিশ্র পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, ‘ডাইরেক্ট, ইনডাইরেক্ট প্রিন্সিপাল কী মৌলিক অধিকার ভঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে?’ এই কথার পরে সওয়ালে সিংভি দাবি করেন, ইডি অফিসারদের আইনের দেওয়া ক্ষমতা রয়েছে কিন্তু তা অধিকার নয়। তাই তদন্ত করার কোনও মৌলিক অধিকার তাদের নেই। আইনজীবীর সওয়াল অনুযায়ী, ‘ ইডি নিজে রাষ্ট্রের এক শক্তিশালী সংস্থা। তাই তদন্তের সময়ে একজন ইডি অফিসার হিসাবে তিনি এমন কোনও আলাদা অধিকার দাবি করতে পারেন না, যা তাঁর দপ্তরের নিজেরই নেই।’
অন্যদিকে, মামলাটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৪৮ সালে সংবিধান প্রণয়ন সভার বিতর্কের উল্লেখ করেন। মেনকা সওয়ালে বলেন, ‘সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। ইডি অফিসারেরা যদি অফিসার হিসেবে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেন, তা হলে সরকার নিজেই নিজের বিরুদ্ধে এই ধারা ব্যবহার করছে।’ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে মৌলিক অধিকারের প্রতিষ্ঠিত ধারণা বদলে দেওয়ারও অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিরোধ হলে ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করতে হবে। ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নয়।’ মেনকার সংযোজন, ‘নাগরিকদের রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই এই অধিকারগুলি দেওয়া। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে বিশ্বজুড়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র লঙ্ঘিত বা পদদলিত করতে পারব না।’
রাজ্যের আইনজীবীদের সওয়াল শুনে পাল্টা কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার দাবি,‘মামলা রাজ্যের পক্ষে যাচ্ছে না। তাই ঘটনার দিনের কোনও কথা না বলে অতীতের বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মামলা খারিজ করতে চাইছে।’
এর পরে বিচারপতি মিশ্রের নিজের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এই ভাবে হেঁটে তদন্তের জায়গায় ঢুকে পড়তে পারেন না, পুরো গণতন্ত্রকে উনি বিপদে ফেলতে পারেন না।’ একইসঙ্গে মেনকা গুরুস্বামীর উদ্দেশে বিচারপতি মিশ্র নিজের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘আপনি যে সব কেসের রায়ের উল্লেখ করেছেন, সেই সব রায় দেওয়ার সময়ে কোনওদিন ভাবাই যায়নি যে এমন দিনও আসবে এই দেশে যেখানে একটি রাজ্যের একজন মুখ্যমন্ত্রী অন্য একটি কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তে ঢুকে পড়বেন।’