শুভেন্দু, অধীর, দিলীপ, মানস থেকে মৌসম, গৌতম, শঙ্কর, অগ্নিমিত্রা, স্বপ্না, হুমায়ুন! আর কারা প্রথম দফায় নজরকাড়া?
আনন্দবাজার | ২৩ এপ্রিল ২০২৬
রাজ্যে প্রথম দফায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বৃহস্পতিবার। এই কেন্দ্রগুলির মধ্যে কোথাও জোর টক্কর তৃণমূল-বিজেপির, কোথাও এগিয়ে রয়েছে কংগ্রেস। কোথাও আবার নজরে সিপিএমের প্রার্থী। শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন, ফল যন্ত্রবন্দি হবে বৃহস্পতিবার। প্রথম দফার ভোটে নজরে থাকবেন ৩০ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথম বার ভোটের ময়দানে। অনেকেই আছেন পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। অন্য দিকে, ভোটে জিতে মন্ত্রিত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে অনেকের।
প্রথম দফায় সমগ্র উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির ভোটগ্রহণ হয়ে যাবে— দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ। পাশাপাশি, জঙ্গলমহলেও প্রথম দফায় নির্বাচন রয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদে এই দফাতেই ভোট হবে। অন্য দিকে, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানেও এই দফায় ভোটগ্রহণ।
প্রথম দফার ভোটে অনেকেরই নজর নন্দীগ্রামের দিকে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে এই কেন্দ্রে লড়াই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর। তবে সেই ভোটে মমতাকে হারতে হয়েছিল শুভেন্দুর কাছে। এ বারও এই কেন্দ্রে লড়াইয়ে রয়েছেন শুভেন্দু। বিজেপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে এ বার নন্দীগ্রামে তৃণমূলের অস্ত্র প্রাক্তন এক বিজেপি নেতা। তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর এক কালে তৃণমূল করলেও ২০২০ সালে শুভেন্দু বিজেপিতে যাওয়ার কিছু দিন আগেই পদ্ম শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। হয়েছিলেন বিজেপির ব্লক সভাপতি। শুধু রাজনীতি নয়, হিন্দুত্ববাদী একাধিক সংগঠনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন পবিত্র। তবে গত ১৭ মার্চ সকালে অভিষেকের হাত থেকে তৃণমূলের পতাকা তুলে নেন নন্দীগ্রামের বয়াল এলাকার এই নেতা। আর সেই দিন বিকেলেই তাঁকে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করে তৃণমূল।
শুভেন্দু-পবিত্রের লড়াই যেমন রয়েছে, তেমন প্রথম দফায় নজর থাকবে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের দিকে। এ বার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের তুরুপের তাস অধীর চৌধুরী। বহু বছর সংসদীয় রাজনীতির অলিগলিতে অবাধ বিচরণ করেছেন তিনি। লোসকভায় কংগ্রেসের দলনেতাও ছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী ইউসূফ পঠানের কাছে হারতে হয় তাঁকে। খোয়াতে হয় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদও। অনেকেই অধীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে তাঁকে যে রাজনীতি ছাড়বে না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন অধীর। এ বারের বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে তিনি। বহরমপুর কেন্দ্রে লড়লেও তাঁর বিচরণ গোটা মুর্শিদাবাদেই। হাবেভাবে কিংবা কথায় বার বার তা বুঝিয়েও দিয়েছেন কংগ্রেসের অধীর।
বহরমপুর ছাড়়াও মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘি, রেজিনগর, ডোমকল কেন্দ্রগুলির দিকেও নজর থাকবে। সাগরদিঘিতে এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেছে বায়রন বিশ্বাসকে। এই বায়রনই সাগরদিঘির বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে লড়েছিলেন। জিতেছিলেন। তাঁর জয়ের নেপথ্যে ছিলেন অধীরই। তবে জেতার পর কংগ্রেসের হাত ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন বায়রন। তৃণমূলে থাকলেও ভোটের কয়েক দিন আগে দলবদল নিয়ে আক্ষেপ শোনা গিয়েছিল তাঁর গলায়। অধীরকেই ‘গুরুদেব’ বলেছিলেন তিনি। অনেকেই ভোটের মুখে তাঁর দলবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছিলেন। তবে আপাতত তিনি তৃণমূলেই। আর তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ চক্রবর্তীর। কংগ্রেসের প্রার্থী তিনি। বহরমপুরের প্রাক্তন বিধায়কও বটে। তবে এ বার লড়ছেন সাগরদিঘি থেকে।
এ ছাড়াও নজর থাকবে রেজিনগর ও ডোমকল বিধানসভা কেন্দ্রের দিকে। এই দুই কেন্দ্রেই লড়াইয়ে দুই হুমায়ুন কবীর। এক সময় দু’জনেই তৃণমূলে ছিলেন। জিতেওছিলেন। কিন্তু ভোটের আগে সুর বদলে ফেলেন ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক হুমায়ুন। তৃণমূল থেকে নিলম্বিত হওয়ার পর নতুন দল গঠন করেন। প্রথমে সেই রাজনৈতিক দলের নাম ছিল জনতা উন্নয়ন পার্টি। পরে দলের আগে জুড়ে দেন ‘আম’। তাঁর দলের চিহ্ন ‘হুইসেল’ বা ‘বাঁশি’। আমজনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন এ বার আসন বদলে লড়ছেন রেজিনগর থেকে। তবে ভোটের আগে তৃণমূলের প্রকাশ করা তাঁর ‘গোপন ভিডিয়ো’ নিয়ে কিছু বিপাকে হুমায়ুন। ভোটের মুখে অনেকেই তাঁর দল ছাড়ছেন। জোট ভেঙেছেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিমও। সেই হুমায়ুনের রেজিনগরে ফল নির্ধারণ বৃহস্পতিবার। তবে তিনি লড়ছেন নওদা বিধানসভা কেন্দ্র থেকেও।
আর এক হুমায়ুন পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার বিদায়ী বিধায়ক। তিনি প্রাক্তন আইপিএস। তবে এ বার তাঁর আসন বদলেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি লড়ছেন ডোমকল কেন্দ্র থেকে। আসন বদলে হুমায়ুনের ফলে ছাপ ফেলবে কি না, তা বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করবেন ডোমকলের ভোটারেরা। প্রথম দফার ভোটে নজরে রয়েছে খড়্গপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্র। ১০ বছর পর আবার ‘চেনা ময়দানে’ বিজেপির দিলীপ ঘোষ। ২০১৬-র পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার তাঁকে খড়্গপুর সদরে প্রার্থী করেছে বিজেপি।
প্রথম দফার ভোটে লড়াইয়ে রয়েছেন পাঁচ মন্ত্রীও। দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক উদয়ন গুহকেই এ বার টিকিট দিয়েছে তৃণমূল। তিনি রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রীও বটে। এ ছাড়াও, মানসরঞ্জন ভুঁইয়া, বিরবাহা হাঁসদা, মলয় ঘটকও লড়াইয়ে রয়েছেন। সবংয়েই এ বার মানস লড়ছেন তৃণমূলের টিকিটে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় একাধিক বার তাঁর দফতর বদল হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেচমন্ত্রী। আর এক মন্ত্রী মলয় এ বার লড়ছেন আসানসোল উত্তর থেকে। মমতার মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী ছিলেন তিনি। কিন্তু ভোটের মুখেই তাঁর দফতর বদল করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে মলয়ের হাতে রয়েছে শ্রম দফতর। বনমন্ত্রী বিরবাহা এ বারও লড়ছেন বিনপুর থেকে। মমতার ‘আস্থাভাজন’ বলেই পরিচিত আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেত্রী বিরবাহা। এ ছাড়াও নজরে থাকবেন সুজাপুরের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের শ্রম এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন।
মেখলিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে এ বারও তৃণমূল পরেশ অধিকারীকে টিকিট দিয়েছে। রাজ্যের শিক্ষা দুর্নীতি মামলায় নাম জড়িয়েছিল তাঁর। সেই কারণে খোয়াতে হয়েছিল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর পদ। এ ছাড়াও, মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন সাংসদ তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে এ বার প্রার্থী করেছে বিজেপি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে কোচবিহার থেকে লড়ে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। নজরে থাকবে রাজগঞ্জ বিধানসভাও। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে জলপাইগুড়ির এই রাজগঞ্জে জিতেছিল তৃণমূলই। খগেশ্বর রায় তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। তবে এ বার তাঁর জায়গায় এই কেন্দ্রে তৃণমূল টিকিট দিয়েছে সোনাজয়ী প্রাক্তন অ্যাথিলিট স্বপ্না বর্মণকে।
শিলিগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার লড়াই বিজেপির শঙ্কর ঘোষ এবং তৃণমূলের গৌতম দেবের মধ্যে। গত বিধানসভা নির্বাচনে ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা থেকে লড়েছিলেন শিলিগুড়ির মেয়র। ২০২৬ সালে তাঁর আসন বদলেছে। এ বার তাঁর লড়াই শিলিগুড়িরই বিদায়ী বিধায়ক শঙ্করের সঙ্গে। বালুরঘাটে তৃণমূল প্রার্থী করেছে অর্পিতা ঘোষকে। বালুরঘাটের ভূমিকন্যা তিনি। প্রাক্তন সাংসদও ছিলেন। এ বার তাঁর উপর ভরসা করল রাজ্যের শাসকদল।
মালতিপুরের তারকা প্রার্থী মৌসম বেনজির নুর। কংগ্রেসি পরিবারে বড় হওয়া। তবে এক সময় ‘হাত’ ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। মমতা তাঁকে রাজ্যসভায় সাংসদ করে পাঠিয়েছিলেন। তবে ভোটের মুখে আবার পুরনো দলে ফিরে যান মৌসম। পূর্ব মেদিনীপুরে ময়না কেন্দ্রে এ বার বিজেপির প্রার্থী প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক দিন্ডা। ওই জেলারই আর এক কেন্দ্র রামনগরের দিকেও নজর থাকবে। ওই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী অখিল গিরি। মমতার মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন এক সময়। তবে পরে মন্ত্রিত্ব হারান। শুভেন্দু ছাড়াও অধিকারী পরিবারের আর এক সদস্য দিব্যেন্দুও এ বার বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে। তিনি এগরা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী।
ডেবরা বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার প্রার্থী বদলেছে তৃণমূল। গত বার এই কেন্দ্রে লড়ে জিতেছিলেন প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন। এ বার তাঁকে পাঠানো হয়েছে ডোমকলে। আর ডেবরায় প্রার্থী করা হয়েছে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। একটা সময়ে মমতার মন্ত্রিসভায় বনমন্ত্রী ছিলেন তিনি। কিন্তু মাঝে ফুলবদল করেছিলেন রাজীব। তবে বছর কয়েক আগে বিজেপির ‘মোহ’ কাটিয়ে আবার ফিরেছেন পুরনো ঘরে। রাজীবকে এ বারের ভোটে ডেবরায় পাঠিয়েছে তৃণমূল। কেশপুরে তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহার দিকেও নজর থাকবে প্রথম দফার ভোটে।
বাঁকুড়ার রানিবাঁধ বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিএম এ বার টিকিট দিয়েছে দেবলীনা হেমব্রমকে। বাম আমলে মন্ত্রী ছিলেন তিনি। এ বারের ভোটে তাঁর কী ফল হয়, নজর থাকবে সে দিকেও। এ ছাড়াও, বিজেপির জিতেন্দ্র তিওয়ারি, অগ্নিমিত্রা পাল এবং জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ও নজরকাড়া প্রার্থী। জিতেন্দ্র লড়ছেন পাণ্ডবেশ্বর থেকে। অগ্নিমিত্রা এবং জগন্নাথ লড়ছেন যথাক্রমে আসানসোল দক্ষিণ এবং সিউড়ি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। এ ছাড়াও প্রথম দফার ভোটে অন্যতম নজরকাড়া প্রার্থী হাসনে ফয়জ়ুল শেখ। রাজনীতির ময়দানে সকলে তাঁকে কাজল শেখ বলেই চেনেন। বীরভূমের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ কাজলের নির্বাচনী লড়াইও নজর কাড়বে।
উল্লেখ্য, প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে, তার মধ্যে গত বারের নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল ৯২টি আসন। বিজেপির ঝুলিতে ছিল ৫৯টি। আর কালিম্পং আসন জিতেছিলেন রুদেন সাদা লেপচা। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা তিনি।