• প্রচার নয়, ভোট আগে! টানা সাড়ে চার ঘণ্টা দলীয় দফতরে ভোটদানে নজরদারি শাহের, দিনের শেষে ফলের ‘আভাস’
    আনন্দবাজার | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • আগে ভোট, পরে প্রচার!

    পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিনকে এই নীতিতেই সাজালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ২১ এপ্রিল রাতেই চলে এসেছিলেন কলকাতায়। ২৭ তারিখ পর্যন্ত কলকাতাতেই তিনি ঘাঁটি গাড়ছেন বলে সে দিনই বিজেপি সূত্রে জানানো হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই যে সেই সিদ্ধান্ত, তা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ক্রমশ স্পষ্ট হল। দলের ‘ওয়ার রুম’ এবং ‘কন্ট্রোল রুম’-এ ঘুরে ঘুরে টানা সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে শাহ নজরদারি চালালেন ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার উপরে। নানা মহলে ‘জরুরি বার্তা’ পাঠালেন। প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট মোটের উপরে নির্বিঘ্নে পড়ে গিয়েছে দেখার পরে দলীয় দফতর ছেড়ে রওনা দিলেন নির্ধারিত জনসভা এবং রোড শোয়ের পথে।

    বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এসেছেন পশ্চিমবঙ্গে। মোদীর জনসভা প্রথমে ছিল কৃষ্ণনগরে। তার পরে কাকদ্বীপে। সব শেষে বেলুড়ে রোড শো। শাহেরও জন্যও তিনটি প্রকাশ্য কর্মসূচিই নির্ধারিত ছিল। প্রথমে বলাগড় এবং পুরশুড়ায় দু’টি জনসভা। তার পরে মধ্যমগ্রামে রোড শো। কিন্তু শাহের কর্মসূচিগুলি ভেবেচিন্তেই কিছুটা দেরিতে রাখা হয়েছিল। কারণ, ভোটগ্রহণের দিন প্রচার করার আগে ‘ভোট করা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই ‘ভোট করা’ বা ‘ভোট করানো’র প্রশ্নে মোদীর কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নাম অমিত শাহ। মোদী গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন শাহ গুজরাতে ভোট ‘করিয়েছেন’। মোদী দলের তরফে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষিত হওয়ার পরে শাহ দায়িত্ব নিয়ে উত্তরপ্রদেশে ভোট ‘করিয়েছেন’। এ বার এ রাজ্যেও বিজেপির ‘ভোট অভিযান’-এর পুরোভাগে সেই শাহ। তাই ভোটগ্রহণের দিন প্রচারকে কিছুটা পিছনে ঠেলে দিলেন।

    বিধাননগরের সেক্টর ফাইভে বিজেপির দফতরে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি দু’টি বাড়ি নিয়ে দফতর বিজেপির। দু’টি বাড়িতেই একাধিক হলে ‘সমর কক্ষ’ (ওয়ার রুম) এবং ‘নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়েছিল। ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটির জন্যই আলাদা আলাদা নেতা ও কর্মী দায়িত্বে ছিলেন। ফোনে এবং অন্যান্য মাধ্যমে ভোটগ্রহণের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া চলছিল। কোথাও গোলমাল বা সমস্যা তৈরি হলে সেখান থেকে বিজেপি দফতরে ফোন আসছিল। বিজেপির ওয়ার রুম সমস্যার ধরন বুঝে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ যোগাযোগ করছিল।

    শাহ দলীয় দফতরে পৌঁছে প্রথমে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। রাজ্য নেতৃত্বের তরফে যাঁরা ভোটের গতিপ্রকৃতিতে নজর রাখছেন, তাঁদের থেকে খোঁজখবর নেন। তার পরে ওয়ার রুম, কন্ট্রোল রুমে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন।

    দলের তরফে যাঁরা কন্ট্রোল রুম এবং ওয়ার রুমে ছিলেন, কমিশনের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ তাঁরাই রাখছিলেন। প্রয়োজনে পর্যবেক্ষক (অবজ়ার্ভার), সেক্টর অফিসার বা সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছিলেন। শাহ সরাসরি সে সবের মধ্যে ঢোকেননি। তবে বিজেপি সূত্রের দাবি, ভোটগ্রহণের গতিপ্রকৃতি দেখে যাকে যেমন বার্তা দেওয়া দরকার, দলের কার্যালয়ে বসেই অমিত শাহ তা দিয়েছেন।

    ভোট পর্যবেক্ষণের ফাঁকে দলীয় দফতরেই শাহ দুপুরের খাওয়া সেরে নেন। বেলা ২টো ২০ মিনিট নাগাদ তিনি দফতর ছাড়েন। ততক্ষণে প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছে। ভোট পড়ার পরিমাণ শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছতে পারে, বিজেপির দীর্ঘদিনের ‘ভোট-চাণক্য’ সে আন্দাজও পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই কিছুটা ‘প্রশান্তি’ নিয়েই তিনি দলীয় দফতর থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। বলাগড় এবং পুরশুড়ার সভায় গিয়ে প্রায় ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করার ভঙ্গিতে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিদি সাফ হয়ে গিয়েছেন।’’

    পুরশুড়া থেকে হেলিকপ্টারে যখন কলকাতা বিমানবন্দরে ফিরছেন, তখন সূর্য অস্তাচলে। কপ্টার থেকে সেই দৃশ্যের ভিডিয়ো রেকর্ড করেন শাহ। সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন কলকাতার দিগন্তে সূর্যাস্তের সেই ছবি। লেখেন, ‘তৃণমূলের দুর্নীতি এবং গুন্ডারাজের সূর্য অস্ত গিয়েছে।’ বিমানবন্দর থেকে শাহ রওনা দেন মধ্যমগ্রামের উদ্দেশে। সেখানকার বিজেপি প্রার্থী অনিন্দ্য (রাজু) বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে রোড শো শেষ করেন মধ্যমগ্রাম চৌমাথায়। ট্রাকের উপরে দাঁড়িয়ে সেখানে যে নাতিদীর্ঘ ভাষণ তিনি দেন, তাতেও ফের ভোটের ফলাফল নিয়ে ‘পূর্বাভাস’ দেন। শাহ বলেন, ‘‘প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়ে গিয়েছে। তার ফলাফল জানতে চান কি?’’ জমায়েতের ইতিবাচক উত্তর পেয়ে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিদি সাফ হয়ে গিয়েছেন।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)