ভয়ডরহীন জঙ্গলমহল, নন্দীগ্রামে ভোট-উৎসব, একুশের রক্তাক্ত ছবি বদলে গেল কোন ম্যাজিকে?
প্রতিদিন | ২৪ এপ্রিল ২০২৬
বাংলার ভোটে বড় বেশি হিংসা হয়। এই ধারণা থেকে এবার রক্তপাতহীন ভোট করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই দেড় মাস আগে থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। রেকর্ড সংখ্যক জওয়ানকে শুধুমাত্র বাংলার ভোট সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই কাজে কমিশন সামগ্রিকভাবে কতটা সফল হল, তা তো বোঝা যাবে ৪ মে-র পর। বৃহস্পতিবার প্রথম দফা ভোট শেষে অন্তত এটুকু বলা যায়, একুশের বা চব্বিশের নির্বাচনের তুলনায় ছাব্বিশের ভোট অনেক শান্তিপূর্ণ। ভয়ডরহীন পরিবেশে উৎসবের আবহে হয়ে গেল উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গের ১৫২ আসনে নির্বাচন। এতে স্বভাবতই রাজনৈতিক দল থেকে আমজনতা, সকলে খুশি। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন ম্যাজিকে একুশের রক্তাক্ত নির্বাচনী আবহ বদলে গেল এমন শান্তিপূর্ণ ছবিতে?
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বদলের চিত্রটা একবার দেখে নেওয়া যাক। পূর্ব মেদিনীপুরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্র নন্দীগ্রাম। একুশে এখানকার ভোটে কী হয়েছিল, কেমন হয়েছিল, তা সকলের জানা। দিনভর বিভিন্ন জায়গা বিজেপি-তৃণমূলের সংঘর্ষের ছবিটা হয়ত এখনও মনে আছে। আর ফলপ্রকাশের দিন আচমকা লোডশেডিং – রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিতর্কিত বিষয়। সে প্রসঙ্গ থাক। ছাব্বিশের নন্দীগ্রামের ভোটচিত্র কেমন? দেখা গেল, অতি শান্তভাবে ভোট হয়েছে সেখানে। একুশের ভোটে যাঁরা বাড়ি থেকে বেরতেই পারেননি, এবার তাঁরা বুথে গিয়ে নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। মুখে তৃপ্তির চওড়া হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা। তৃণমূল এবং বিজেপি দু’পক্ষই ভোটারদের সাহায্য করেছে বলে দেখা গিয়েছে। দুপুর ১২ টার মধ্যে এখানকার বেশিরভাগ বুথে ভোট শেষ। বিকেলের দিকে দু-একটা বুথের লম্বা লাইন বুঝিয়ে দিয়েছে, ভোটদানের রাস্তা কতটা মসৃণ। সবমিলিয়ে নন্দীগ্রাম এত সুষ্ঠু, শান্ত ভোটের ছবি আগে কবে দেখেছে, মনে করতে পারছেন না কেউ।
পশ্চিম মেদিনীপুরেও একই ছবি। আগে কেশপুর, খড়গপুর, দাঁতনের মতো জায়গায় সংঘর্ষের ছবিটা ছিল চেনা। বৃহস্পতিবার একমাত্র দাঁতন ছাড়া কোথাও কোনও অশান্তি ঘটেনি। বাঁকুড়ার কোতুলপুর ছাড়া কোনও নির্বাচনী সংঘর্ষের খবর সারাদিনে পাওয়া যায়নি। বুথে বুথে দেখা গেল, ঘাসফুল শিবির কিছুটা ঝিমিয়ে, পদ্ম ব্রিগেড বেশ চাঙ্গা। ঝাড়গ্রামের ভোটচিত্র বরাবর বেশ শান্ত। এমনকী মাওবাদীদের দাপট থাকাকালীনও রাজ্য পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া প্রহরায় ভোটে অশান্তি হয়নি তেমন। এবারও একেবারে উৎসবের আবহে ভোট হল। দু-একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া জেলাজুড়ে নির্বিঘ্নে কেটেছে ভোটদান পর্ব। সকাল থেকে লম্বা লাইন ছিল বুথে বুথে। উৎসবের মেজাজে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন সাধারণ মানুষ। কুড়মি অধ্যুষিত গ্রামের মহিলা পুরুষরা সকাল থেকেই ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসি মুখ নিয়ে। বিনপুর, গোপীবল্লভপুর, ঝাড়গ্রাম, নয়াগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটাররা শামিল হয়েছিলেন গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবে।
এবার আসা যাক পুরুলিয়ার কথায়। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে এখানে মোটের উপর শান্তিপূর্ণ হলেও চব্বিশে কিন্তু বেশ উত্তপ্ত পরিবেশ ছিল। দিনভর নানা জায়গায় সংঘর্ষের খবর মিলেছিল। এমনকী ধর্মে ধর্মে রেষারেষিও একটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এক প্রিসাইডিং অফিসার লুঙ্গি পরে বুথে বসেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন বিজেপির সাংসদ পদপ্রার্থী জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। পদ্মঝড়ের প্রবল দাপট ছিল সেবার। ছাব্বিশে সেই ছবি পুরো বদলে গিয়েছে। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি, হিন্দুত্বের চোরা হাওয়া রয়েছে, প্রকাশ্যে তেমনটা নেই। তার প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়ি। তবে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবও নেই। বরং জওয়ানদের উপর ভরসা রেখেই সকলে নির্ভয়ে ভোট দিতে গিয়েছেন। আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। এই জেলায় বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে বাহিনীর নজরদারি কিছুটা আলগা। উলটো ছবিটা তৃণমূলের জমিতে। বাহিনী যেন বেশিই কড়া সেখানে। অর্থাৎ নরমে-গরমে বাহিনীর তত্বাবধানে মূলত শান্তিপূর্ণ ভোটের ছবিটা ধরা পড়েছে। কারণ যাই হোক, এবারের মতো শান্তিপূর্ণ ভোটচিত্র বহুদিন দেখেনি রাজ্য, তা মেনে নিচ্ছেন সবাই।