বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল), তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় সকাল ১০টা ছুঁয়েছে। ততক্ষণে প্রায় ৩ ঘণ্টা ভোটগ্রহণ হয়ে গিয়েছে। সেই সময়েই BJP-র সল্টলেকের পার্টি অফিসে পা পড়ল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। সেখানেই এ দিন তৈরি হয়েছিল BJP-র ‘ওয়ার রুম’। সেখানে সেনাপতি সেই যে ঢুকলেন, বের হন দুপুর আড়াইটের পরে। একুশের থেকে অনেকটাই বদলে গেল ছবিটা। এই প্রথম সরাসরি পার্টি অফিস থেকে বঙ্গের ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করলেন ‘BJP-র চাণক্য’।
বঙ্গ BJP সূত্রে জানা গিয়েছে, ওয়ার রুমে বসে বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি, কর্মকাণ্ড এবং ভোটদানের প্রবণতার উপরে নজর রাখেন অমিত শাহ। ওয়ার রুমের দলের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন।
তবে শুধু মনিটরিং করা এবং পরামর্শ দেওয়াই নয়, দলের প্রতিটি বিভাগে ঘুরে ঘুরে দপ্তরের সাধারণ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলে তাঁদের উৎসাহও দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমনটাই জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মূলত ‘ম্যাক্রো-লেভেল’ প্রচার এবং ‘হাই-পিচড রেটরিক’-এর উপরে জোর দিয়েছিলেন অমিত শাহ তথা BJP। মোদী সামনে থাকলেও তিনিই ছিলেন BJP-র প্রচারের প্রধান মুখ। শাহের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ ছিল মিছিল, রোড শো এবং জনসভার মধ্যে।
ভোটের দিনে সরাসরি কলকাতায় ওয়ার রুমে বসে রিয়েল-টাইম মনিটরিং বা বুথ-লেভেল ফিডব্যাক নেননি। বদলে ভোটের পর দিল্লি থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে কর্মীদের কাজের প্রশংসা করেছিলেন আর দাবি করেছিলেন ২০০ আসন পাওয়ার। কিন্তু তাতে আশানুরূপ ফল মেলেনি।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এ বার ‘রিয়েল-টাইম মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট’-এ জোর দিয়েছেন শাহ বলে BJP সূত্রে খবর। রাজ্যে প্রায় ১৫ দিন ক্যাম্প করে রয়েছেন তিনি। প্রতিটি আসনে ২০,০০০ ভোটের বাফার তৈরির যে টার্গেট দিয়েছিলেন তিনি।
শুধু টার্গেট সেট করে দেওয়া নয়, এ দিন ওয়ার রুমে বসে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি আসনের পরিস্থিতির সরাসরি আপডেট নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি কর্মীদের ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ কাজ’, ‘তৃণমূল স্তরে সমন্বয়’ এবং ‘ভোটারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ’ বজায় রাখার কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গের আসনগুলি BJP-র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। BJP সূত্রে জানা গিয়েছে, ওয়ার রুমের ইউনিফায়েড কমান্ড সেন্টার থেকে সরাসরি বুথ এজেন্টদের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্স করেন শাহ। রাজবংশী সম্প্রদায় এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির প্রভাব কতটা বুথ স্তরে পড়েছে, রিয়েল-টাইম অ্যাপের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বের এই ‘হ্যান্ডস-অন অ্যাপ্রোচ’ নিচুতলার কর্মীদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। সল্টলেকের ওয়ার রুমে স্বয়ং অমিত শাহের উপস্থিতিতে নিচুতলার কর্মীদের মনোবল উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক কর্মীর কথায়, ‘কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে আমাদের একা ছেড়ে দেয়নি, তা আজ প্রমাণিত।’
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত BJP তথা অমিত শাহের এই অভূতপূর্ব ওয়ার-রুম স্ট্র্যাটেজি নিয়ে রাজ্যের শাসকদল বা অন্যান্য বিরোধী দলগুলির তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। একুশে ‘ম্যাক্রো-লেভেল’ প্রচারে কাজ হয়নি। ছাব্বিশে অমিত শাহের ‘রিয়েল-টাইম মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট’-এ কতটা কাজ হয়, ৪ মে তা স্পষ্ট হবে।