‘স্লগ ওভারে’ এসে গতি বাড়াতে তৎপর শাহ, প্রোটোকল সরিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হেলিকপ্টার বরাদ্দ করা হল সুকান্তের জন্য
আনন্দবাজার | ২৬ এপ্রিল ২০২৬
বিজেপির রাজ্য নেতারা আড়ালে-আবডালে বলছেন ‘কার্পেটবম্বিং’। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের উপর আকাশ থেকে ভারী মাত্রায় বোমাবর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গেপ্রচারাভিযানের ‘ওজন’ বিজেপি যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, রূপকার্থে তাকে তৃণমূলেরউপরে ‘বোমাবর্ষণ’ বললে ভুল হয় না বলে অনেকে মনে করছেন। সে সব ‘বোমা’ যে আকাশথেকেই বর্ষিত হচ্ছে, তা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। কারণ, প্রতিদিন যত বেশিসম্ভব কর্মসূচিতে ‘তারকা প্রচারক’দের পাঠানোর তাগিদে ঢালাও হেলিকপ্টারের বন্দোবস্তহয়েছে। আকাশপথে রাজ্য চষে ফেলছেন বিজেপি নেতারা। প্রচারপর্বের শেষপর্যায়ে পৌঁছে গতি আরও বাড়াতে অমিত শাহ নিজের জন্য বরাদ্দ হেলিকপ্টারটিও অন্যদেরজন্য মাঝেমধ্যে ছেড়ে দিচ্ছেন।
যেমন শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরব্যবহার্য হেলিকপ্টারটি বরাদ্দ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও উত্তরপূর্ব উন্নয়নপ্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের জন্য। প্রথম দফার ভোটের আগে সুকান্ত উত্তরবঙ্গেইবেশি সময় দিয়েছেন। সেখানেও তাঁর জন্য দল হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা রেখেছিল। প্রথমদফার ভোট সেরে দক্ষিণবঙ্গে ফেরার পরেও তিনি কলকাতা থেকে দূরবর্তী জেলাগুলিতেআকাশপথেই যাচ্ছিলেন। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বা কেন্দ্রীয় স্তর থেকেআসা তারকা প্রচারকদের জন্যও একই ব্যবস্থা হচ্ছিল। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গে প্রচারের শেষতিন দিনে বিজেপি এমন ‘তারকার মেলা’ বসিয়েছে, যে শাহকেও অবসরে নিজের কপ্টার ছেড়েদিতে হচ্ছে।
শনিবার শাহের জনসংযোগ কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল দুপুরেরপর থেকে। পৌনে তিনটেয় পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে প্রথম জনসভা। বিকেলে হাওড়ার শ্যামপুরেজনসভা। তার পরে হাওড়ার রামরাজাতলা এবং দক্ষিণ কলকাতার রানিকুঠিতে রোড শো। কলকাতাথেকে জামালপুর হেলিকপ্টারে পৌঁছতে বড়জোর আধ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই বেলা পৌনে তিনটেয়সভা থাকলে দুপুর ২টো ১৫ নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে ওড়াই যথেষ্ট। অতএব শাহেরজন্য বরাদ্দ হেলিকপ্টার শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বরাদ্দ করে দেওয়া হয়সুকান্তের জন্য।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য ভারতীয় বায়ুসেনারতিনটি হেলিকপ্টার এখন কলকাতা বিমানবন্দরেই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে দিনগুলিতেপশ্চিমবঙ্গে থাকছেন, সে সব দিনে আরও দু’টি করে হেলিকপ্টার বিমানবন্দরে এনে রাখা হয়‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসাবে। অর্থাৎ, যে তিনটি কপ্টারের বহর নিয়ে তিনি যাতায়াত করেন,তার মধ্যে কোনওটিতে সমস্যা থাকলে যাতে তৎক্ষণাৎ বিকল্পের ব্যবস্থা করা যায়। শনিবারপ্রধানমন্ত্রী কলকাতায় ছিলেন না-বলে অতিরিক্ত দু’টি হেলিকপ্টার বিমানবন্দরে এনেরাখা হয়নি। বাকি তিনটি বিমানবন্দরের টারম্যাকে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সর্বোচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তার কারণে সেগুলি অন্য কারও জন্য বরাদ্দ করার অবকাশ ছিল না।
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই শাহের হেলিকপ্টারওসাধারণত আলাদা রাখা হয়। অন্য কাউকে তা দেওয়া হয় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভানির্বাচনের প্রচারে এ ধরনের প্রোটোকল বা নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের গেরো যাতেপ্রচারাভিযানের গতিরোধ না-করে, শাহ সে বিষয়ে সতর্ক। তাই নিজের জন্য বরাদ্দহেলিকপ্টারটি তিনি বসিয়ে রাখার পক্ষপাতী নন। শাহের মতো সুকান্তেরও শনিবার চারটিকর্মসূচি ছিল। সবক’টিই রোড শো। প্রথমে পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ এবং মেমারিতে। তারপরে কলকাতায় ফিরে বেহালা পশ্চিম এবং কলকাতা বন্দর বিধানসভা কেন্দ্রে। সকাল সাড়ে৯টা নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছে যান সুকান্ত। টারম্যাকে পৌঁছে বুঝতে পারেন, এতদিন যেটিতে যাতায়াত করেছেন, এটি সেই হেলিকপ্টার নয়। নতুন এবং আধুনিক সুবিধাযুক্ত।উড়ান শুরুর আগে পাইলট যখন সওয়ারিদের নিয়মমাফিক ‘ব্রিফ’ করছেন, তখন জানা যায় যে,যানটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্যই এসেছে এবং সেটি একেবারেই নতুন।
১০টা ২০ নাগাদ কলকাতা থেকে উড়ে ১০টা ৪৮ মিনিটেখণ্ডঘোষ পৌঁছোন সুকান্ত। সেখানকার রোড শো সেরে আবার হেলিপ্যাড এবং আকাশপথে মেমারি।তখন কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে ১২টা। ওই সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টার ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিলসুকান্তের। তাই তাঁকে মেমারিতে নামিয়ে সেটি কলকাতা ফিরে আসে শাহকে নিয়ে জামালপুররওনা দেওয়ার জন্য। আর মেমারির কর্মসূচি সেরে সড়কপথে বিকেলের মধ্যেই কলকাতা ফিরেআসেন সুকান্ত।
শনিবার শাহ ছাড়াও বিজেপির কেন্দ্রীয় স্তর থেকে আসাএকঝাঁক ‘ওজনদার’ নাম দক্ষিণবঙ্গ চষে বেড়িয়েছেন। রাজনাথ সিংহ, জেপি নড্ডা, নিতিননবীন, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, স্মৃতি ইরানি, মনোজ তিওয়ারি তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও ঘন ঘন যাওয়া আসা করছেন। তাই প্রচারের ‘স্লগওভারে’ বিজেপিতে হেলিকপ্টারের চাহিদা তুঙ্গে। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াহচ্ছে ‘শাহি’ প্রোটোকলকেও।