এই সময়: দ্বিতীয় দফার ভোটের বাকি আর ৭২ ঘণ্টা। তার আগে শনিবার একদিনে ছ’–সাত ঘণ্টার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঝোড়ো প্রচার চালাল তৃণমূল। জনসভা, পদযাত্রা, রোড–শো মিলিয়ে একদিনে ১১টি কর্মসূচি করেছেন দু’জন। শুধু এই দু’জনই নন, তৃণমূলের বাকি নেতৃত্বের পাশাপাশি বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদবও এ দিন জোড়াফুলের হয়ে একাধিক জনসভা করেছেন। শেষবেলায় ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ায় শুভেন্দু অধিকারীর সমর্থনে প্রচারে বিজেপির মাইক বাজায় তৃণমূলনেত্রীর সভার তাল অবশ্য কিছুটা কেটেছে। আজ, প্রচারের শেষ রবিবারও একগুচ্ছ কর্মসূচি রয়েছে মমতা–অভিষেকের।
তৃণমূল নেতৃত্ব শনিবারও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে দিনের প্রথম সভাতেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক খোলাখুলি বলেছেন, ‘গত পরশুদিন (বৃহস্পতিবার) প্রথম দফার ভোট হয়েছে। তৃণমূল সেঞ্চুরি পার করে দিয়েছে। আগামী ২৯ তারিখ ডাবল সেঞ্চুরি পার হবে। সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, আমি নিজেও জানি না।’ হুগলির উত্তরপাড়ার সভায় আবার মমতা নাম না–করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আগামী ৪ তারিখ যখন কাউন্টিং হবে, তখন তোমারই ঝাল লাগবে। জ্বলবে আর লুচির মতো ফুলবে।...আমরা ইতিমধ্যে একশো ক্রস করে গিয়েছি। যে আসনগুলিতে ভোট রয়েছে, সেখানেও মানুষ আমাদের সমর্থন করবেন। আমরাই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। এটা না হলে, এটা (সংখ্যা) অল্প থাকলে, ওরা (বিধায়ক) কেনাবেচা করে। এই ভাবে মহারাষ্ট্রে ওরা সরকার ভেঙে দিয়েছে।’ শনিবার রাতে বেহালা চৌরাস্তার মোড়ে শেষ সভাতেও মমতা দাবি করেছেন, প্রথম দফার ভোটেই তৃণমূলের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা একশো পেরিয়ে গিয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, প্রথম দফার ভোটে জনতার সমর্থন কোন দিকে গিয়েছে, সেটা আঁচ করেই গেরুয়া শিবিরের নেতারা প্রবল চাপে পড়ে গিয়েছেন। উত্তরপাড়া এবং ভবানীপুরের একটি সভায় তৃণমূলনেত্রীর বক্তব্য, ‘বিজেপি কেমন খেপে গিয়েছে? খুব চাপ! প্রবল দৌড়োদৌড়ি করছে। আজ (শনিবার) নাকি ওদের ৫০টা হেলিকপ্টার আকাশে উড়েছে। এখানে সব মিলিয়ে ১৯ জন মুখ্যমন্ত্রী প্রচার করে গিয়েছেন।’
উত্তরপাড়ায় জনসভা সেরে মমতা উত্তর দমদম কেন্দ্রের বিরাটিতে পদযাত্রা করেন। সেখান থেকে ভবানীপুরে ঢুকে শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিট থেকে কালীঘাট রোড পর্যন্ত পদযাত্রায় সামিল হন তিনি। তারপরে আবার ভবানীপুরে রাজেন্দ্র রোড এবং জাস্টিস দ্বারকানাথ রোডের মোড়ে জনসভা করেন মমতা। চক্রবেড়িয়ায় অবশ্য তৃণমূলনেত্রীর প্রচারের ছন্দ কিছুটা কাটে। স্বামীনারায়ণ মন্দিরের কাছে মমতার জনসভার কাছেই জোরে মাইক বাজছিল। তৃণমূলের অভিযোগ, মমতার মঞ্চের কাছ পর্যন্ত এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দুর সভার মাইক লাগানো ছিল। তৃণমূলনেত্রী মঞ্চে উঠেই গেরুয়া শিবিরের মাইকের প্রবল আওয়াজ শুনে চটে যান। মমতা বলেন, ‘কেন এটা করবে? ওরাও যে দিন মিটিং করবে, তোমরা (তৃণমূল কর্মীরা) পাল্টা লাগিয়ে দেবে। তখন পুলিশ খুলতে এলে মেয়েদের দিয়ে এফআইআর করাবে।’ এরপরে মমতা মোবাইলে কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন। এই সভায় সুব্রত বক্সী, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো তৃণমূল নেতারা ছিলেন। মোবাইলে কথা সেরে মমতা বলেন, ‘আমি সভার জন্য সব অনুমতি নিয়েছি। আমার কেন্দ্রে ওরা এটা করছে! আমি আইনি পদক্ষেপ করব। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করেছে। চিৎকার করছে, যাতে মিটিং না করতে পারি। এটা অপমানজনক। আমি কাল (রবিবার) ওখানে কর্মসূচি করব। এর প্রতিবাদে আপনারা ভোট দেবেন।’
এই কথা বলেই সভায় আনুষ্ঠানিক ভাষণ না দিয়ে মমতা বেহালার কর্মসূচিতে চলে যান। যদিও বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূলের মাইক বাজার কারণে শুভেন্দু অধিকারীও ভবানীপুরে ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর একটি কর্মসূচি করতে পারেনি। শুভেন্দুর বাড়ি বাড়ি প্রচার কর্মসূচি ছিল, কিন্তু মাইকে প্রবল শব্দে ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগান চলতে থাকায় বিরোধী দলনেতা প্রচার করতে পারেননি বলে বিজেপির দাবি। শুভেন্দু হাঁটা থামিয়ে দিয়ে কোথায় কোথায় মাইক লাগানো রয়েছে, তা আঙুল তুলে দেখান। তিনিও নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করবেন বলে জানান। বিজেপির কর্মসূচির অনুমতি থাকা সত্ত্বেও সেখানে তৃণমূল মাইক লাগিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। আবার তৃণমূল কর্মীরাও দাবি করেন তাঁদের সভার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে মমতার পদযাত্রা চলছিল ভবানীপুরেরই এক প্রান্তে। শুভেন্দু পরে রাতে ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের সভায় বলেন, ‘আমি দুপুরে ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়েছিলাম। মাইক বাজছিল কেন? আগে পতাকা, পোস্টার ছিঁড়েছেন অনেক। অসভ্যতা করবেন না। তৃণমূলকে বলব, ভদ্র ভাবে থাকুন।’ অভিষেক আবার শনিবার রাতে কাঁকুড়গাছি থেকে বিধাননগর স্টেশন পর্যন্ত রোড–শো করে এ দিনের ছ’নম্বর কর্মসূচি শেষ করেছেন। মানিকতলার তৃণমূল প্রার্থী শ্রেয়া পাণ্ডের সমর্থনে রোড–শোয়ের শেষে অভিষেক বলেন, ‘সাধন পাণ্ডের উন্নয়নের ধারা এখানে অব্যাহত থাকবে। শ্রেয়া এখানে হেল্থ ক্যাম্প করেছে। অনেক কাজ করেছে, যা ভালো জনপ্রতিনিধি হওয়ার লক্ষণ। শ্রেয়ার বয়স কম, ছুটে–দৌড়ে কাজ করবে।’