• নজর ওয়ার রুমেও, এই ভোটে শাহই বঙ্গ বিজেপির ‘হেড স্যার’
    এই সময় | ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • মণিপুষ্পক সেনগুপ্ত ও জয় সাহা

    এমন ‘হেড মাস্টার’ বঙ্গ বিজেপি আগে দেখেনি। এত দিন পর্যন্ত দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ ছিলেন তাঁদের কাছে অনেক দূরের মানুষ। তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারতেন হাতে গোনা কিছু নেতাই। কিন্তু এখন বুথস্তরের কর্মীরাও শাহের ফোন পাচ্ছেন। সরাসরি তাঁকেই আপডেট দিতে পারছেন সাধারণ ‘কার্যকর্তারা’। প্রতিদিনের হিসেব নিকেশ, রণনীতিতে এক্সপার্ট কমেন্টস তো দিচ্ছেনই, এমনকী সেই সব মানা হলো কি না, হোটেলে বসে সেই সবেরও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব নিচ্ছেন তিনি। সকাল-রাতের মাঝখানে প্রতিদিনই তিন চারটি করে সভা বা রোড শো-তেও বেরোচ্ছেন নিয়ম করে। ফলে সব মিলিয়ে একজন কঠোর হেড মাস্টারের অধীনে আরও বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ, টার্গেট ওরিয়েন্টেড হয়ে উঠেছেন বঙ্গ বিজেপির নেতারা। পড়া না পারলেই যদি কান মুলে দেন, সেই ভয়ে বাধ্য ছাত্রের মতোই হোম টাস্ক, ক্লাস ওয়ার্কে মন দিয়েছেন সকলে। কারণ, শাহি দরবারে নিজেকে ‘ফার্স্ট বয়’ প্রমাণ করার তাগিদও রয়েছে প্রত্যেকের।

    দিন তিনেক আগে অমিত শাহ কলকাতায় পা রেখেছেন। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত কলকাতায় থাকবেন। নিউটাউনের একটি হোটেলই আপাতত দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ঠিকানা। সেখানে আনাগোনা লেগেই রয়েছে বিজেপির নেতা-কর্মীদের। নিরাপত্তা, প্রোটোকলের ঘেরাটোপ এড়িয়ে বিজেপির বঙ্গ নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ভোকাল টনিকই শুধু নয়, কী ভাবে বাংলায় ভোট করাতে হবে, সে বিষয়েও ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘সেই যে গীতার শ্লোক ছিল না, কর্ম করে যাও, ফলের আশা কোরো না, অমিত শাহজি যেন সেই শ্লোককেই বাস্তবে পরিণত করেছেন।’ বঙ্গ-বিজেপির এক প্রবীণ নেতা বলছেন, ‘দেখুন ফলাফল যাই হোক না কেন, এমন একজন নেতা যে ভাবে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের খোঁজ রাখছেন, প্রায় ২৯৪টি কেন্দ্র নিয়ে নিজের অ্যাসেসমেন্ট করছেন, টিপস দিচ্ছেন, সেটাই আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। এ ভাবে এত বড় মাপের নেতাকে যে আমরা পাবো তা ভাবতে পারিনি।’

    বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, একেবারে কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান, পুজো অর্চনা সেরে পার্টির কাজে বসে পড়ছেন শাহ। কোন কোন েকন্দ্রে ওই দিন প্রচার কেমন ভাবে হবে, তার যাবতীয় প্ল্যান করে দিচ্ছেন। প্রার্থীদের প্রচার কোন কোন জায়গায় হচ্ছে, কোন বুথ এলাকায় সেই দিন প্রচার রয়েছে, কোথায় এখনও প্রার্থী পৌঁছতে পারেননি, সেই সব হিসেব নিজের হাতে কষে নিয়ে কার্যত ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ দিচ্ছেন তিনি। রাতে ফিরে সেই কাজ কতটা হলো, যে যে বুথ বা এলাকায় তিনি প্রার্থীদের যেতে বলেছিলেন সেই সব কভার করা হলো কি না, তা নিয়েও আপডেট নিচ্ছেন। যদি দেখা যায়, যে বুথগুলি কভার করার কথা শাহ বলেছিলেন, কোনও কারণে সেখানে প্রার্থী পৌঁছতে পারেননি, তাহলে কেন পৌঁছননি সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হচ্ছে তাঁকে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি প্রার্থীর সঙ্গেও ফোনে কথা বলে নিচ্ছেন। সকালের কাজ সেরে বেলা হতেই নিজে বেরিয়ে পড়ছেন প্রচারে। দুপুরে প্রচারের ফাঁকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার বিজেপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেখা করে এলাকার খোঁজ খবর নেওয়া। বিকেল-সন্ধ্যায় ফের প্রচারের ব্যস্ততা। সেটা মিটিয়ে নিয়েই রাতে হোটেলে ফিরে আরও এক প্রস্ত বঙ্গ-বিজয়ের পরিকল্পনা সারছেন তিনি। এই পর্বে আরও একবার রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ। এমন অনেক কেন্দ্র রয়েছে যেখানে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার বিজেপির নেতা-কর্মীরা। কোথাও প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ, কোথাও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অভিমান। আবার এমনও অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে শাসকদলের নেতাদের ভয়ে কর্মীরা হয়তো বা ভীত-সন্ত্রস্ত। সংশ্লিষ্ট নেতাদের ফোন করে সেই সব নিচু তলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন শাহ। অভয় দিচ্ছেন, সাহসও জোগাচ্ছেন।

    গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের দিন সল্টলেকে বিজেপির কেন্দ্রীয় ‘ওয়ার-রুম’-এ বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছেন তিনি। রাজ্যজুড়ে কেমন ভোট হচ্ছে, সেটা নিজের চোখে মনিটর করেছেন। সেই ‘ওয়ার-রুম’-এ উপস্থিত এক নেতার কথায়, ‘ওই ওয়ার-রুমে আমরা একজন নতুন অমিত শাহকে দেখেছি। সেখানে তিনি সর্বোচ্চ নেতা নন। যেন আমাদেরই মতো কেউ একজন। একেবারে জুনিয়র কর্মীদের থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সব জেনেছেন, তারপর ফাইনালি এক্সপার্ট কমেন্ট দিয়েছেন।’ বঙ্গ-বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, এমন একজন ‘গাইড’ থাকাতে কঠিন মাটিতে লড়াইটা যেন অনেকটাই সহজ গিয়েছে। এখন দেখার অমিত শাহের এই পরিশ্রমের ‘পদ্ম’ ৪ মে রেজাল্টের দিন ফোটে কি না।

  • Link to this news (এই সময়)