এই সময়: রাজ্যের ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর অথবা সার)–এর ফলে মতুয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। যা নিয়ে তীব্র অসন্তোষও ছড়িয়েছে বিভিন্ন মহলে। এমনকী, প্রতি বারের মতো এ বারও মতুয়ারা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দেবেন কি না, তা নিয়ে গেরুয়া শিবিরেই ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে। ভোট প্রচারের শেষ লগ্নে তাই মতুয়া ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
রবিবার দু’জনেই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেন — ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া মতুয়া ভোটারদের নাম ফের তালিকায় ঠাঁই পেতে চলেছে। ‘সার’ নিয়ে বিজেপির উপরে পাল্টা চাপ তৈরি করার কৌশল নিয়েছে তৃণমূল। ‘সার’–এর আতঙ্কে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে রাজ্যের শাসকদল। এ দিন ভবানীপুরের সভা থেকে সে কথা ফের একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সার ইস্যুতে বিজেপি আর নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে মমতা বলেন, ‘সারে বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। এই যে এত মানুষ মারা গিয়েছে, তার জবাব কে দেবে? তাদের পরিবার ছেড়ে কথা বলবে না। বিএলও মারা গিয়েছেন। সুইসাইড নোটে মৃত্যুর কারণ লিখে গিয়েছেন। এর জবাব কে দেবে?’
রবিবার মোদী নির্বাচনী সভা করেন মতুয়া প্রভাবিত উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর ঠাকুরনগরে। এ দিনই অমিত শাহের সভা ছিল আর এক মতুয়া প্রভাবিত এলাকা, নদিয়ার রানাঘাটে। ঠাকুরনগরের জনসভা থেকে মতুয়া সমাজকে আশ্বস্ত করে নাগরিকত্বের গ্যারান্টি দেন মোদী। বলেন, ‘সব শরণার্থী পরিবারকে বলছি, দেশের এক জন নাগরিকের যে যে কাগজ থাকা প্রয়োজন, সে সব আপনারা পাবেন। এটা মোদীর গ্যারান্টি।’ একই লক্ষ্যে রানাঘাটের সভা থেকে শাহের প্রতিশ্রুতি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ষড়যন্ত্র করে বেশ কিছু মতুয়া ভাই–বোনদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। ৪ তারিখ আমাদের সরকার হবে। ৫ তারিখ থেকে নাম তোলার কাজ শুরু হয়ে যাবে।’ তবে রাজ্য সরকার কী ভাবে ভোটার তালিকায় নাম তুলবে, সেই প্রশ্ন প্রত্যাশিত ভাবেই উঠছে। কারণ, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজনের অধিকার রয়েছে শুধু নির্বাচন কমিশনের। যা একটি সাংবিধানিক সংস্থা।
২০১৯–এর লোকসভা ভোট থেকেই মতুয়ারা ঢালাও সমর্থন দিয়ে আসছে বিজেপিকে। কিন্তু ‘সার’–এর জেরে মতুয়া আর বিজেপির সেই পুরোনো সমীকরণ কার্যত ঘেঁটে গিয়েছে বলে তৃণমূলের দাবি। মতুয়াদের একাংশের নাম বাদ পড়ার প্রেক্ষিতে তৃণমূলও জোরদার প্রচার চালিয়েছে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে। মোদী এ দিন ঠাকুরনগরের সভা থেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, গেরুয়া ব্রিগেডের সঙ্গে বাঙালি শরণার্থীদের যোগাযোগ বহু পুরোনো। বিজেপির আদিপুরুষ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বাঙালি শরণার্থীদের প্রবক্তা বলে অভিহিত করা হতো বলেও এ দিন দাবি করেন নমো। তাঁর কথায়, ‘গঙ্গার যেমন উৎপত্তি গঙ্গোত্রী থেকে, তেমনই বিজেপির উৎপত্তি জনসঙ্ঘ থেকে। আর জনসঙ্ঘের উৎপত্তি আবার বাংলা থেকে।’
মোদীর কথায়, ‘দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনেই জনসঙ্ঘ এ রাজ্যে খাতা খুলেছিল। কলকাতা থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জিতেছিলেন। বাংলার বিভিন্ন জেলায় জনসঙ্ঘ ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল জনসঙ্ঘ। কোথাও জনসঙ্ঘের সরকার ছিল না। কিন্তু শরণার্থীদের ইস্যুকে জনসঙ্ঘই তুলেছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শরণার্থীদের প্রবক্তা হিসেবে ধরা হতো।’ ঐতিহাসিক ভাবে বিজেপি শরণার্থীদের পাশে আছে সেই বার্তা দিতে প্রধানমন্ত্রীর সংযোজন, ‘শ্যামাপ্রাসদ মুখোপাধ্যায় আর জনসঙ্ঘের সংস্কার বিজেপির ভিতরে আছে। তাই প্রত্যেক শরণার্থী পরিবারের দায়িত্ব আমাদের। আপনাদের সুখ–দুঃখ নিয়ে চিন্তা করার ভার আমাদের উপরে।’
জনসভা থেকে মতুয়াদের প্রতি মোদীর আহ্বান, ‘আপনারা কেউ তৃণমূলকে ভোট দেবেন না। ওরা আপনাদের ভুল বোঝাচ্ছে। আপনারা তৃণমূলকে ভোট দিলে আপনাদের পূর্বপুরুষরা কষ্ট পাবেন।’ যে ‘মা–মাটি–মানুষ’ তৃণমূলের সিগনেচার স্লোগান, তাকে কটাক্ষ করে নমো বলেছেন, ‘এখন বাংলার মায়ের চোখে জল। মাটি অনুপ্রবেশকারীদের দখলে।’