সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
যত নজর অলিগলিতে!
দ্বিতীয় তথা শেষ দফায় আগামী বুধবার নির্বাচনের আগে বিশেষ করে কলকাতায় শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য এই অলিগলিতেই সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল এবং দক্ষিণ শহরতলির কিছু এলাকার গলিঘুঁজিতেও বাড়তি নজর রাখা হবে। বিগত কিছু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে কমিশনের আধিকারিকরা মনে করছেন, সাধারণত শহরাঞ্চলে বুথ বা ভোটকেন্দ্র সংলগ্ন অলিগলি আটকে রেখে ভোটারদের বাধাদানের চেষ্টা করে রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা। আবার অনেক সময়ে শাসক–বিরোধী রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে এই সব তল্লাটে। তাই গলিতে বাইক নিয়ে টহলদারির পাশাপাশি গলি বা সরু রাস্তায় বাড়তি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে কমিশন।
প্রথম দফার ভোটের আগেই কমিশন বোমাবাজির ঘটনা নিয়ে পুলিশকে সতর্ক করে দিয়েছিল। এও বলা হয়েছিল, বোমাবাজি হলে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি বা সুপারভাইজ়িং অফিসারের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে রবিবার ভাঙড়ের উত্তর কাশীপুর থানা এলাকায় তৃণমূল কর্মী রফিকুল ইসলামের বাড়ির পিছনে বাগান থেকে মোট ১০০টি তাজা বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই সময়ে বোমা তৈরি বা মজুতের ঘটনা নজরে এলে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত পুলিশ নয়, করবে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। যদিও বোমা উদ্ধারের জন্য অভিযান চালাবে পুলিশই।
কমিশন সূত্রের খবর, দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন বুথের আশপাশে প্রায় ৪৫০ এবং উত্তর কলকাতায় ২৫০–এর বেশি গলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাওড়া, ব্যারাকপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর, নরেন্দ্রপুর, নদিয়ার নবদ্বীপ, কষ্ণনগর, হুগলির চন্দননগর, চাঁপদানি সমেত বেশি কিছু ঘিঞ্জি রাস্তা ও গলিকেও মার্ক করা হয়েছে। অনেক সময়ে বুথ বা তার আশপাশে গোলমাল পাকিয়ে দুষ্কৃতীরা এই সব গলি ধরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
দ্বিতীয় দফায় সব বিধানসভা কেন্দ্রকেই নিরাপত্তার প্রশ্নে সংবেদনশীল হিসেবে সমগুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন। তবে তার মধ্যেও সব মিলিয়ে পাঁচ থেকে ছ’হাজার বুথকে অতি স্পর্শকাতর বা সংবেদনশীল বুথ হিসেবে প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতি স্পর্শকাতর বুথগুলির ভিতরে ও বাইরে ছাড়াও বুথ লাগোয়া রাস্তায় অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। দ্বিতীয় দফার ভোটে কলকাতা পুলিশ এলাকায় সর্বোচ্চ ২২৯টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) মোতায়েন হচ্ছে। এর বাইরেও ৫৭টি ফ্লাইং সার্ভেল্যান্স টিম (এফএসটি) ও স্ট্যাটিক সার্ভেল্যান্স টিমও (এসএসটি) থাকছে শহরে। কলকাতার পরেই সবচেয়ে বেশি কিউআরটি থাকবে হুগলি গ্রামীণ পুলিশ এলাকায় (২০৪)। কলকাতার টালিগঞ্জ, বালিগঞ্জ এবং রাসবিহারী বিধানসভা এলাকার বহুতলগুলিতে জেনারেল অবজ়ার্ভার এবং পুলিশ আবজ়ার্ভারদের ভোট চলাকালীন পরিদর্শনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। ভোটের দিন সেক্টর অফিসার থেকে বিএলও, প্রিসাইডিং অফিসার সবাইকেই ভোটারদের পরিচয়পত্র ভালো করে যাচাই করার উপরে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। প্রথম দফার মতো বুথের আশপাশে ১০০ মিটার এলাকায় ‘লক্ষ্মণরেখা’ কেটে দেওয়া হবে। ভোটার নন, এমন ়কেউ ওই গণ্ডির ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল রবিবার বলেন, ‘বুথে বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। অভিযোগ জমা পড়লে ঘটনার সময়ে এবং তার আগে ও পরের ফুটেজ দেখা হবে। বুথের আশপাশে সরু গলিতে টহলের জন্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বাইক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’
সিইও রবিবার সকালে বায়ুসেনার হেলিকপ্টারে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ এবং পূর্ব বর্ধমানের কালনা-কাটোয়ায় ভোটের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন। প্রতিটি এলাকাতেই প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এবং প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতিনিধিদের সিইও জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটদানে কেউ বাধা দিলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। মনোজের কথায়, ‘ভুয়ো ভোট, হুমকি— এ সব হতে দেবো না। ভোটদানের হার যাতে ৯০ শতাংশের বেশি হয়, তা নিশ্চিত করতে সবরকম পদক্ষেপ করা হবে।’
ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে এ দিন সকালে ‘ধনধান্য’ অডিটোরিয়ামে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে। সেখানে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দুই পুলিশ জেলার এসপি, কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সূত্রের খবর সিপি সেখানে জানিয়েছেন, কমিশন আইন–শৃঙ্খলার প্রশ্নে জি়রো টলারেন্স নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। তাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিস্ফোরক উদ্ধার, ট্রাবল মেকারদের গ্রেপ্তার করতে হবে। জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রয়েছে, এমন কেউ যেন ভোটের দিন বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেউ কোথাও ভয় দেখাচ্ছে, এমন অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।