এ যাত্রায় মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলো না সিংহম এবং পুষ্পার! প্রথম জন দিনভর টহল দিয়ে বেড়ালেন। আর দ্বিতীয় জন নিজেকে বন্দি রাখলেন চার দেওয়ালের মধ্যে। পড়ন্ত বিকেলে বেরিয়ে ভোট দিলেন। ফিরে এসে আবার ঘরবন্দি! ভোটের দিনে দুই যুযুধান পক্ষের গতিবিধির নির্যাস এটুকুই।
ভোটের কয়েক ঘণ্টা আগে সিংহমের ‘সিংহগর্জন’ গোটা রাজ্যে সাড়া ফেলেছিল। শুষে নিয়েছিল প্রচারের প্রায় সব আলোই। কিন্তু ভোটের দিনে সে সব কিছুই দেখা গেল না সেই অর্থে। আপাত নিস্তরঙ্গই রইলেন উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা সেই আইপিএস অফিসার অজয়পাল শর্মা। অন্তত দৃশ্যত। তবে সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে তিনি দিনভর ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ালেন। বৈঠকও করলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে। কিন্তু গত দু’দিনে তাঁকে যে ভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন রাজ্যবাসী, সেই ছবির দেখা মিলল না।
যদিও প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, তেমনটা হওয়ারও কথা ছিল না। অজয় পুলিশ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলায় এসেছেন। তাঁর কাজ ছিল, তাঁর আওতাধীন এলাকায় যাতে অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ ভোট হয়, তার পরিবেশ তৈরি করা। তাই তিনি ভোটের আগে যে ভাবে সক্রিয় ছিলেন, ভোটের দিন সেই একই রকমের সক্রিয়তা অন্তত প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার কথা নয়। আর যদি অশান্তির পরিস্থিতি তৈরিই না হয়, তা হলে অহেতুক ‘হম্বিতম্বি’রও প্রয়োজন পড়ে না।
বুধবার সকালে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণ পরেই সাঁজোয়া গাড়ি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে পৈলান থেকে বেরোন অজয়। ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে শিরাকল হয়ে তাঁর কনভয় যায় ডায়মন্ড হারবারের দিকে। সেখানে প্রথমে সিআরপিএফ-এর ডিজির সঙ্গে বৈঠক করেন অজয়। আধঘণ্টা বৈঠকের পর তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যান ফলতার দিকে। সেই পুষ্পা অর্থাৎ জাহাঙ্গির খানের এলাকায়।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বুধবারও ফলতার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন অজয়। তাঁর সঙ্গে বিশাল বাহিনী ছিল। এলাকার পরিদর্শনের পর ফলতার বিবেকানন্দ আদর্শ বিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ক্যাম্পে যান তিনি। সেখানেও একটি বৈঠক করেন পুুলিশ পর্যবেক্ষক। পরে আধাসেনার ওই শিবিরেই একটি ঘটনা ঘটে। সূত্রের খবর, রঞ্জিত মণ্ডল এবং সুন্দরী মণ্ডল নামে দু’জন ক্যাম্পে এসে অজয়ের খোঁজ করেন। তাঁরা দাবি, তাঁরা ফলতার বেনিয়াবাটি গ্রামের ২০২ এবং ২০৪ নম্বর বুথের ভোটার। ইতিমধ্যেই তাঁরা ভোট দিয়েছেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বাড়িতেও ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। সেই কারণেই তাঁরা সোজা ক্যাম্পে এসেছেন অজয়ের সঙ্গে দেখা করতে। নিরাপত্তা চাইতে। রঞ্জিত এবং সুন্দরীর কাছে থেকে এই অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাঁদের সঙ্গে নিয়ে বেরোন আইপিএস অফিসার। সঙ্গে বাহিনীও ছিল। পরে দু’জনকে বাড়িও পৌঁছে দেন তিনি।
অন্য দিকে, জাহাঙ্গির বুধবার সারা দিনই কাটিয়ে দিলেন নিজের দলীয় কার্যালয়ে। ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছে, সকাল ৬টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন ফলতার তৃণমূল প্রার্থী। সেখানে তাঁকে ঘিরে ছিলেন গুটিকয়েক নেতা-কর্মী। কার্যালয়ে তাঁদের সঙ্গে বসেই তিনি ভোট পরিচালনা করেছেন। এক ঘনিষ্ঠের কথায়, ‘এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। দাদা এভাবেই ভোট পরিচালনা করেন। এলাকায় ঘুরে ঘুরে নয়।’ পরে বিকেলে শ্রীরামপুর পশ্চিম দুর্গাপুর বিদ্যালয়ে ভোট দিতে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গির। ভোট দিয়ে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সাধারণ মানুষের উপর অকারণে লাঠিচার্জ করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন ফলতার মানুষের সঙ্গে অন্যায় করেছে। জাহাঙ্গির তোপ দেগেছেন সিংহমের বিরুদ্ধেও। বলেছেন, ‘৪ মে-র কী ভাবে ওকে উত্তরপ্রদেশে পাঠাতে হয় দেখাব।’
এই বিতর্কের সূত্রপাত গত সোমবার। সে দিন ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের বাড়িতে গিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল অজয়ের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার একটি ভিডিয়োও প্রকাশ্যে আসে। এই সময় অনলাইন অবশ্য সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি। ওই ভিডিয়োয় অজয়কে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘আপনারা তো জাহাঙ্গিরের বাড়ির লোক। ওকে বলে দেবেন, যদি আবার কাউকে হুমকি দেয় ওর লোকেরা, ভালো করে ওর চিকিৎসা করব।’
ভিডিয়োটি প্রকাশ্যে আসার পর অজয়ের বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ ওঠা শুরু হয়। দাবি করা হয়, পুলিশ পর্যবেক্ষকও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের হুমকি দিয়েছেন। তিনি এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়। জাহাঙ্গিরও পরে অজয়ের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। বলেন, ‘উনি সিংহম হলে আমি পুষ্পা! ঝুকেগা নেহি! ঝুঁকতে হলে মানুষের সামনে ঝুঁকব। তৃণমূল কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করার চেষ্টা চলছে। উনি বিজেপির কথায় চলছেন।’
কিন্তু যে ফলতায় এত বার অভিযান চালালেন পুলিশ পর্যবেক্ষক, সেই ফলতায় পুরোপুরি নির্বিঘ্নে ভোট হয়েছে, তা নয়। সেখান থেকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর মিলেছে। শুধু তা-ই ফলতার একটি বুথে ইভিএমে বিজেপির প্রতীকের পাশে সাদা টেপ লাগিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল জানান, যেখানে যেখানে ইভিএমে কালো বা সাদা টেপ দেখা গিয়েছে, সেখানে পুনর্নির্বাচন হবে। জাহাঙ্গির অবশ্য ইভিএমে টেপ লাগানোর অভিযোগকে বিজেপির ‘সাজানো’ বলে দাবি করেছেন।
তবে প্রশাসনের অনেকের মত, ইভিএমে টেপ লাগানোর ঘটনার সঙ্গে সরাসরি আইনশৃঙ্খলার কোনও যোগ নেই। এ ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার কথা কমিশনের। সেখানে পুলিশ পর্যবেক্ষকের আলাদা করে কোনও ভূমিকা থাকার কথা নয়।