রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্র। বলা যেতে পারে, এ বারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে হাই প্রোফাইল কেন্দ্র ভবানীপুর। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। দ্বিতীয় দফার ভোটে বুধবার যে ১৪২ আসনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছে, তার মধ্যে দিনভর সবচেয়ে বেশি নজর ছিল দক্ষিণ কলকাতার এই কেন্দ্রেই। আর দ্বিতীয় দফার ভোটে সকাল থেকেই সরগরম থাকল ভবানীপুর।
এ দিন সকাল থেকেই বুথে বুথে ঘুরতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সকালেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। নির্বাচন কমিশন বিজেপির কথায় কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো। তার সঙ্গেই তৃণমূলের পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন। এ দিন ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পরে চেতলায় ফিরহাদ হাকিমের বাড়ির সামনে যান মুখ্যমন্ত্রী। গাড়ির সামনে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন ফিরহাদ হাকিম।
এ দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধেও বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের চক্রবেড়িয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, গতকাল মধ্যরাত থেকে ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলারের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। ভাঙড়েও তৃণমূল কর্মীদের উপর অত্যাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। তবে সেই ঘটনায় তাঁর অভিযোগ ছিল মূলত পুলিশের বিরুদ্ধে। নির্বাচন কমিশনের অবজ়ার্ভারেরা থানায় গিয়ে চাপ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন মমতা।
মমতা এই অভিযোগ করার কিছুক্ষণ পরেই ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ওই জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এক সময়ে কার্যত ‘মুখোমুখি’ চলে এসেছিলেন মমতা ও শুভেন্দু। মমতা যখন রাস্তার পাশে থাকা পার্টি অফিসে, ঠিক তখন ওই রাস্তায় উপরেই চলে আসেন শুভেন্দু। সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, ওঁকে (অর্থাৎ মমতাকে) কেউ ভোট দিচ্ছে না। পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লোক নিয়ে এসে গুন্ডামি করার অভিযোগও করেন শুভেন্দু। এ দিন ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশনের বুথেও যান শুভেন্দু অধিকারী। ওই বুথের ভোটার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এই বুথেও জিতব’।
একটু বেলা গড়াতেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভবানীপুরের ছবি। কালীঘাটের ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডের ২১৭ ও ২১৮ নম্বর বুথের সামনে যান শুভেন্দু। সেখানে গাড়ি থেকেই নামতেই তাঁকে ঘিরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন তৃণমূল কর্মীরা। শোনা যায় ‘চোর’ স্লোগানও। ওই ঘটনায় পাল্টা স্লোগান দিতে থাকেন বিজেপি কর্মীরাও। পরিস্থিত উত্তপ্ত হয়ে উঠতেই নির্বাচন কমিশনকে ফোন করে আরও কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর অনুরোধ করতে দেখা যায় শুভেন্দু অধিকারীকে। যাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাঁদের ‘বহিরাগত’ বলেও তোপ দাগেন শুভেন্দু অধিকারী। পাল্টা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ করেছে তৃণমূল।
এই সময়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আসরে নামতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে বাহিনী লাঠিচার্জ করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এক সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীকে দৌড়তে দেখা যায়। তার কিছুক্ষণ পরে গাড়িতে উঠে বেরিয়ে যান শুভেন্দু। এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো সামনে আসে, সেখানে দেখা গিয়েছে ভবানীপুরে তৃণমূলের একটি ক্যাম্প অফিসে গিয়ে জল খাচ্ছেন শুভেন্দু। ওই ক্যাম্পের তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে তাঁকে কথা বলতেও দেখা যায়।
এ দিন বিকেলের দিকে ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের বুথে গিয়ে ভোট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার, ভোটের সময় শেষের আগেই মমতা জানিয়ে দেন, তৃণমূল দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতা আসবে। তার কিছুক্ষণ পরে ফের মমতা জানান, দু’শোরও বেশি আসন পাচ্ছে তৃণমূল।
মমতা যখন এ কথা বলছেন, তখন উল্টো দিকে জয় নিয়ে আশাবাদী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি ভবানীপুর জিতছেন বলে বড় দাবিও করেছেন। শুভেন্দু আরও জানিয়েছেন, ভবানীপুরে ৭৭ ও ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে গন্ডগোল হয়। সেখানেই ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী টাইট’ দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর সঙ্গেই তাঁর দাবি, ‘৮০% ভোট পড়লে আমি জিতব। ৯০% ভোট পড়লে ব্যবধান বাড়বে। ৭৭ ছাড়া বাকি সব ক‘টি ওয়ার্ডেই আমি এগিয়ে থাকব।’
দু’দফায় ভোটের পরে এখন ৪ মে-র অপেক্ষা। ওই দিন কী রয়েছে কার ভাগ্যে? অপেক্ষা আর মাত্র ৪ দিনের।