• ভোট শেষেই ঝেঁপে বৃষ্টি, বৃহস্পতিবারেও ঝড়-জলের পূর্বাভাস
    এই সময় | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: এমনিতেও বুধবার সকাল থেকে কলকাতা–সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশে মেঘের আস্তরণ, হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং জোরালো হাওয়ার প্রভাবে আবহাওয়া মোলায়েমই থেকেছে। তেমন প্যাচপ্যাচে গরমও ছিল না। ফলে ৩ কোটি ২২ লক্ষের কাছাকাছি ভোটারের সিংহভাগের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে তেমন সমস্যা হয়নি।

    আবহাওয়া দপ্তর আগেই জানিয়ে রেখেছিল দক্ষিণবঙ্গের ছয় জেলায় কালবৈশাখীর সম্ভাবনা রয়েছে। ভোট মিটতেই রাত আটটার পরে কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি। শুধু শহর কলকাতা নয়, ঝেঁপে বৃষ্টি নামে বেশ কিছু জেলাতেও।

    কলকাতায় সন্ধে সাড়ে আটটা নাগাদ দমকা হাওয়ার সঙ্গে তুমুল বৃষ্টিতে জল জমে যায় বহু রাস্তায়। উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়া, আমহার্স্ট স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, আহিরীটোলা, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, দীনেন্দ্র স্ট্রিট–সহ বিভিন্ন জায়গায় জল জমে যায়। একই ছবি দেখা যায় পার্ক স্ট্রিট, রবীন্দ্র সদন, কালীঘাট, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, টালিগঞ্জ, আলিপুর, মোমিনপুর, একবালপুর, বেহালা, পর্ণশ্রী–সহ বিভিন্ন এলাকায়।

    এমনিতে শহর ছিল শুনশান। তবে বৃষ্টিতে সমস্যায় পড়ে যান ভোটকর্মীরা। ভোট শেষে ডিসিআরসি–তে ইভিএম ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরে নিজেদেরই বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা তাঁদের নিজেদেরই করার কথা ছিল। তাঁদের অনেকেই আটকে পড়েন গভীর রাত পর্যন্ত। এমনিতেই ভোটের কারণে রাস্তায় যানবাহন কম। ফলে চূড়ান্ত ভোগান্তিতে পড়েন তাঁরা। বারাসতের বাসিন্দা ভোটকর্মী রাজীব সরখেল জানান, স্ট্রং রুমে ইভিএম জমা দিয়ে ঘণ্টাদুয়েকের জন্য আটকে পড়েন। রাত দশটার পরে দাপট কমে বৃষ্টির।

    বিধাননগর কলেজের ডিসিআরসি–তে আটকে পড়েন কয়েক শো ভোটকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। কলেজের মাঠে জল জমে যায়।‌ বৃষ্টি মাথায় ইভিএম–সহ ভোটের সরঞ্জাম নিয়ে ডিসিআরসিতে ফিরেছেন ভোটকর্মীরা। কলেজ মাঠের জল–কাদা পেরিয়েই তাঁরা রিসিভিং সেকশনে পৌঁছন।

    বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ের দাপটও ছিল বেশ। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল শিল্পাঞ্চল, পূর্ব বর্ধমানের কালনা, আউশগ্রাম, গুসকরা, পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণা, দাসপুর, পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় কোথাও গাছ ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তার ছিঁড়ে ছিন্ন হয় বিদ্যুত সংযোগও। তবে ঝড়-বৃষ্টিতে টানা কয়েক দিনের তীব্র গরম থেকে স্বস্তি মিলেছে। অনেক জায়গায় সন্ধের পরেও ভোটের লাইন ছিল। সেখানে ঝড়–বৃষ্টির দাপটে সমস্যায় পড়েন ভোটাররা। অভিযোগ, তাঁদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। উত্তরবঙ্গে জলপাইগুড়ির মালবাজার মহকুমা জুড়ে সন্ধেয় বজ্রপাত–সহ প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয়। মঙ্গলবার রাতে নাগরাকাটা ব্লকের সুখানি রাঙাতি নদীতে হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ায়। নাগরাকাটা বস্তির বাসিন্দা কালাচাঁদ শেখ বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতের বৃষ্টিতে সুখানি নদীর জল বাড়ে।’ এক বাসিন্দার দাবি, ‘বেশ কিছু এলাকায় বাড়িতে জলও ঢুকেছে।’

    এ দিকে, হাওড়া-ব্যান্ডেল শাখায় ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটল বুধবার রাতে। ওভারহেডের তার ছিঁড়ে যাওয়ার জেরে হাওড়া ও ব্যান্ডেলের মধ্যে আপ ও ডাউন, দুই লাইনেই ট্রেন চলাচল সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। নির্বাচনের কাজ শেষ করে প্রচুর ভোটকর্মী অপেক্ষা করছিলেন ট্রেন ধরার জন্য। কিন্তু এই বিভ্রাটের জেরে দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে আটকে থাকতে হয় তাঁদের। তবে ১০টা ১১ মিনিট থেকে ট্রেন চলাচল ফের শুরু হয়েছে। হুগলি স্টেশনের ২ নম্বর প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে যায় আপ হাওড়া-ব্যান্ডেল লোকাল। দুন এক্সপ্রেসও দাঁড়িয়ে পড়ে। হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন, কাটোয়া লাইনের একাধিক ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে যায়। যার জেরে টাইম টেবিল মেনে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

    ঘটনা হলো, এ বার নির্বাচনের প্রথম দফার আবহাওয়ার সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আবহাওয়ার কোনও মিলই ছিল না। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটে চড়া তাপমাত্রা এবং ভয়াবহ আপেক্ষিক আর্দ্রতার প্রভাবে পাঁচ জেলায় সাত জন ভোটারের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল। তবে বুধবার, ২৯ এপ্রিল অর্থাৎ দ্বিতীয় দফার ভোটের দু’দিন আগে থেকেই যে দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া বদলাতে শুরু করবে, ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আবহবিদরা। উত্তরপ্রদেশ থেকে নাগাল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত একটি মৌসুমি অক্ষরেখা এবং গাঙ্গেয় বঙ্গের উপরে তৈরি ঘূর্ণাবর্তের মিলিত প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের বড় অংশে বজ্রবিদ্যুৎ–সহ বৃষ্টি ও জোরালো হাওয়ার আবহ তৈরি হয়েছে। বাতাসের জলীয় বাষ্প ওই জোরালো বাতাসের সঙ্গে মিশে আবহাওয়া মনোরম রেখেছিল বুধবার।

    সন্ধ্যায় আলিপুর হাওয়া অফিস যে জেলাভিত্তিক বুলেটিন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে — বুধবার কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দু’ডিগ্রি নীচে। শুধু কলকাতা নয়, এ দিন সল্টলেক (৩২.৬), উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট (৩২.৫), দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং ও সাগরদ্বীপও (৩৩) ছিল অনেকটাই শীতল। অন্য দিকে, বর্ধমান (৩৫), উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর (৩৫.৬) ও হুগলির মগরার (৩৬) তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকলেও আবহাওয়া কখনও প্রথম দফার মতো অসহনীয় জায়গায় পৌঁছয়নি।

    আবহবিদরা জানিয়েছেন, আজ, বৃহস্পতিবার কলকাতা–সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাতেই বজ্রবিদ্যুৎ–সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং হুগলিতে ঘণ্টায় ৫০–৬০ কিমি পর্যন্ত বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এ ছাড়াও আজ পূর্ব বর্ধমান ও উত্তর ২৪ পরগনার কিছু জায়গায় ভারী বৃষ্টিও (৭–১১ সেমি) হতে পারে। কাল, শুক্রবারও দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় বজ্রপাত–সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা।

  • Link to this news (এই সময়)