সুনন্দ ঘোষ
শহরের অলি–গলি ঘুরে হাতে হাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল প্রায় এক লক্ষ কার্ড। তাতে ফোন নম্বর লেখা। একটা নয়, একাধিক। পোশাক পরা অবস্থায় পুলিশকে এমন ভাবে চুপচাপ হাতে ফোন নম্বর লেখা কার্ড গুঁজে দিতে আগে দেখেননি নাগরিকরা।
২৯ এপ্রিল কলকাতার ভোটের দিন কুড়ি আগে থেকে মোটরবাইকে চেপে এসে সেই কার্ড দিয়ে পুলিশ বলে গিয়েছিল, ‘কোথাও কোনও গোলমাল বা বেনিয়ম দেখলে, কেউ এসে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করলে, সঙ্গে সঙ্গে ফোন করুন। অভিযোগকারীর নাম–পরিচয় গোপন রাখা হবে।’
এই শহর এলাকার মধ্য রয়েছে ভাঙড়ও। গোলমালের ‘পীঠস্থান’ বলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই এলাকার বদনাম দীর্ঘদিনের। সেই এলাকা ২০২৪–এর জানুয়ারিতে ঢুকে এসেছে কলকাতা পুলিশের আওতায়। সেখানেও চুপিসাড়ে পৌঁছে গিয়েছিল পুলিশের কার্ড। যার ফল হাতেনাতে পেয়েছেন ভাঙড়ের বাসিন্দারা। ভাঙড়ে নির্বাচনের দিন একটাও বোমা পড়েনি, দেখে অবাকই হয়েছে গোটা পশ্চিমবঙ্গ।
যে এক লক্ষ কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল সাধারণ ভোটারদের হাতে, তা সাধারণ ভিজ়িটিং কার্ডের চেয়ে সাইজ়ে কিছুটা বড়। উপরে লোগো। তার তলায় লেখা ‘কলকাতা পুলিশ’। তার তলায় — ‘ইম্পর্ট্যান্ট নাম্বার’। কার্ডের সামনের দিকে নির্বাচন কমিশন ও লালবাজারের কন্ট্রোল রুমের নম্বর ছাড়াও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের মেল আইডি। কলকাতা পুলিশের এখন ১০টি ডিভিশন। তার মধ্যে ভাঙড়ের জন্য আলাদা ডিভিশন। প্রতিটি ডিভিশনের জন্য তৈরি হয়েছিল আলাদা কার্ড। যেমন নর্থ ডিভিশনের কার্ডের পিছন দিকে রয়েছে সেই ডিভিশনের কন্ট্রোল রুম এবং থানাগুলির মোবাইল নম্বর। একই ভাবে প্রতিটি ডিভিশনের আলাদা নম্বর তুলে দেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের হাতে।
এতে কি লাভ হয়েছে?
কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ বলছেন, প্রভূত সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। প্রচুর ফোন এসেছে মানুষের কাছ থেকে। অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে পুলিশ। রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অজয়ের কথায়, ‘পুলিশের উপর থেকে এই বিশ্বাসটা হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মনে এই ধারণা চেপে বসেছিল যে পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট। তাঁরাই যখন চোখের সামনে দেখলেন, পুলিশ তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন মানুষের মনে কনফিডেন্স তৈরি হলো। পুলিশ শেষ বেলায় যখন গিয়ে বলল, নিশ্চিন্তে ভোট দিন, তাঁরা বিশ্বাস করে ভোটকেন্দ্রে এলেন।’
এটা কী করে সম্ভব হলো? কলকাতা পুলিশের অফিসারেরা জানাচ্ছেন, উপরমহল থেকে নিরপেক্ষ থাকার স্পষ্ট বার্তা এসেছিল। তাতেই কাজ হয়েছে। ভোটের দিন প্রভাবশালী এলাকায় প্রভাবশালীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যবহারের ছবি দেখেছেন বাংলার মানুষ। তাতেই স্পষ্ট হয়েছে পুলিশের ভূমিকা। ভোটের আগে যাঁদের বিরুদ্ধে ধমক–চমকের অভিযোগ উঠছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে সবসময় যে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাতেই ‘কাজ’ হয়েছে। এই অভিযুক্তরা যখন দেখেছেন, ‘নেতা’–দের হস্তক্ষেপের পরেও পুলিশের বডি ল্যাঙ্গোয়েজ বদলাচ্ছে না, তাঁরাও নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। তাতে লাভ হয়েছে সাধারণ মানুষের। ভয় কাটিয়ে মানুষ ভোট দিয়ে গিয়েছেন।