১৮০ দেশের মধ্যে ১৫৭, মোদির ভারতে ধুঁকছে মিডিয়ার স্বাধীনতা
বর্তমান | ০১ মে ২০২৬
নয়াদিল্লি: গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যম। যদিও ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ ভারতে সেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাই ভূলুণ্ঠিত! ‘রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস’ (আরএসএফ)-এর ২০২৬ সালের রিপোর্ট অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আরএসএফ-এর ‘প্রেস ফ্রিডম সূচক’-এ চলতি বছরে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে ১৫৭ নম্বরে। গত বছরের (১৫১তম) তুলনায় আরও ৬ ধাপ পিছিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ, ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সরকারের মুণ্ডপাত করেছে বিশ্বজোড়া সংবাদমাধ্যমের এই নজরদার সংস্থাটি। রাখঢাক না করে তাদের সাফ কথা, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়াগুলি ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’র মুখে পড়েছে। তাঁর আমলে ভারতে সাংবাদিকদের উপর হিংসা ও আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলির মালিকানা প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ কয়েকটি পরিবারের হাতে ভীষণভাবে কুক্ষিগত হয়ে পড়ায় সেগুলি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। প্রধানমন্ত্রীর দল বিজেপি এবং গণমাধ্যমের উপর ছড়ি ঘোরানো প্রভাবশালী বড়ো পরিবারগুলির মধ্যে এক চমকপ্রদ সমঝোতা গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক চাপ এবং ‘গোদি মিডিয়া’র উত্থানের ফলে প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছে মূলস্রোতের গণমাধ্যমগুলির বহুত্ববাদের মডেল।
চলতি বছরের রিপোর্টে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নাম করেও তীব্র সমালোচনা করেছে আরএসএফ। সেখানে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি সাংবাদিক বৈঠক করেন না। তিনি সাক্ষাৎকার দেন শুধুমাত্র সেইসব সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের, যাঁরা গুণকীর্তন করবেন। আর যে সাংবাদিকরা আনুগত্য দেখান না, তাঁদের পড়তে হয় বিজেপির ট্রোল বাহিনীর হেনস্তার মুখে। তাঁদের উপর কখনো হামলা নেমে আসছে, কখনো আবার জুটছে দেশ বিরোধীর তকমা, এমনকি অকারণ গ্রেপ্তারিও। মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সন্ত্রাস দমন সহ কঠোর আইনে মামলা করা হচ্ছে সেই সব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।
তবে শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় অবনমন হয়েছে বলে দাবি আরএসএফ-এর। ২০২৬ সালের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ১৮০টি দেশের গড় স্কোর থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিগত ২৫ বছরের মধ্যে কখনো এতটা নীচে নামেনি। প্রেস ফ্রিডমের ক্ষেত্রে এই প্রথম বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশ ‘গুরুতর’ ও ‘অতি গুরুতর’ ক্যাটিগরিতে চলে এসেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে শীর্ষ পাঁচটি স্থানে রয়েছে নরওয়ে, দি নেদারল্যান্ডস, এস্টোনিয়া, ডেনমার্ক ও সুইডেন। আর সবচেয়ে নীচে যথাক্রমে সৌদি আরব, ইরান, চীন, উত্তর কোরিয়া ও এরিট্রিয়া। চীন (১৭৮তম) বাদে বাকি প্রতিবেশী দেশগুলি ভারতের থেকে এগিয়ে রয়েছে। যেমন নেপাল (৮৭তম), শ্রীলঙ্কা (১৩৪তম), ভুটান (১৫০তম), বাংলাদেশ (১৫২তম) ও পাকিস্তান (১৫৩তম)।
রিপোর্টটিতে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকারও। ২০২৪ সালে ‘বেশ ভালো’ থেকে ২০২৬ সালে ‘সমস্যাসংকুল’ ক্যাটিগরিতে নেমে গিয়েছে আমেরিকা। সাত ধাপ নেমে ট্রাম্পের দেশের স্থান হয়েছে ৬৪তে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও কঠোর বাক্যবাণে বিদ্ধ করেছে আরএসএফ। বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণে সন্ত্রাস-দমন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও কট্টরপন্থা বিরোধী আইনগুলিকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে পুতিনের রাশিয়া। সূচকে তাদের স্থান ১৭২ নম্বরে।