• ভোট দিলেন স্ত্রী, বঞ্চিত স্বামী, ঘরের ভিতর দেওয়াল তুলল এসআইআর
    বর্তমান | ০১ মে ২০২৬
  • অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: এ যেন ঘরের ভিতর আর একটা ঘর! বাপের বাড়ি ছেড়ে আসার পর যাঁর পরিচয়ে তাঁর পরিচয়, সেই গৃহিণী দাঁড়ালেন ভোটের লাইনে। আর ভোটাধিকার হারিয়ে ঘরে বসে রইলেন স্বামী! এখানেই একটা গুরুতর প্রশ্ন ভাবাচ্ছে সবাইকে। সেটা হল, সচিত্র ভোটার কার্ডের তথ্য মিলিয়ে তবেই ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। সেখানে জ্বলজ্বল করছে স্বামীর নাম। সেই স্বামী যদি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তা হলে ভোটার কার্ডের বৈধতা কোথায়? কমিশনের কাছে জবাব চায় কাটোয়াবাসী। 

    কেননা, কাটোয়া মহকুমার তিন বিধানসভায় বাদ পড়েছেন বহু পুরুষ ভোটার। তাঁদের বুথের ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অথচ, বাতিল পুরুষ ভোটারদের ঘরণীরা ভোট দিয়েছেন স্বামীর পরিচয়ে। এসআইআরের দৌলতে সংসারের মধ্যে এমন ‘বিভাজন’ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ বহু মানুষ। তাঁরা বলছেন, ‘একই পরিবারে, একই সংসারে থাকি। স্ত্রীরা ভোট দিতে পারলেও আমরা বঞ্চিত। গত পঞ্চাশ বছরেও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি কোনো নির্বাচনে।’ কাটোয়া শহরে জেরক্স সেন্টারগুলিতে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন ছিল। আতঙ্কে ভোটার স্লিপ জেরক্স করার ধুম পড়ে গিয়েছিল৷ অনেকে আবার তা ল্যামিনেশনও করিয়ে রেখেছেন৷ অনেকে ভাবছেন, এবারের ভোটার স্লিপ অমূল্য সম্পদ। পরে এনআরসি হলে কাজে লাগতে পারে। কখন কি যে সরকার চেয়ে বসবে, তা বোঝা যাচ্ছে না!

    কেতুগ্রামের ৪৬ নম্বর বুথের ভোটার সালে হাসানের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন। সকাল সকাল ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু সালে হাসান সারাদিন ধরে স্ত্রীর আঙুলে কালি দেখে গুমরেছেন৷ সালে বলছিলেন, ‘ভোটাধিকার আমাদের সাংবিধানিক অধিকার৷ ভোটের দিন আঙুলে কালি লাগানো আমাদের কাছে একটা আবেগ। সেই আবেগ নিয়ে ছেলে খেলা করল কমিশন।’ আগরডাঙা গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন রেজার স্ত্রী শিলা বেগমও এবারে ভোট দিতে পেরেছেন৷ কিন্তু, তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন হুমায়ুনর নাম। শিলা বেগম আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসভঙ্গের কাজ করেছে এসআইআর। এর জবাব আমরা দিয়েছি ভোটের মাধ্যমে। আগে স্বামীর সঙ্গে গণতন্ত্রের উৎসবে যোগ দিতাম। এবার দু’জনকে আলাদা করে দিল।’ আফরোজা বিবিরও গলাতেও একই সুর। তাঁর স্বামী লুডু শেখ বলছিলেন, ‘ভোটাধিকার পাওয়া থেকে আমরা একসঙ্গে ভোট দিয়ে আসছি। এবার বিচ্ছিন্ন করে দিল কমিশন! পাড়ায় এখন আমাদের দেখে অনেকেই টিপ্পনি কাটছেন। হাসাহাসি করছেন। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার  কথা বলছেন।’ আলেমা বিবির কথায়, ‘প্রতিবার ভোটে স্বামীকে নিয়ে ভোট দিতে যেতাম। এবার একাই গিয়েছিলাম। স্বামীর ভোট নেই।’ 

    মঙ্গলকোটের চাকদা গ্রামেও ভোট না দিতে পারার হাহাকার। গ্রামের বহু মহিলা ভোট দিলেও স্বামীরা মনমরা হয়ে ঘরে বসে ছিলেন। ফরিদা বিবি নামে এক বধূ বলছিলেন, ‘আমি রাত থেকে কাটোয়ায় মহকুমা শাসকের অফিসে লাইন দিয়েছিলাম। হাজার চেষ্টা করেও স্বামীর নাম তুলতে পারিনি। আশা করেছিলাম যাতে ভোটের দিন পর্যন্ত নাম উঠে যায়৷ কিন্তু সব চেষ্টা বিফলে গিয়েছে৷ একই ঘরে থেকেও আমাদের আলাদা করে দিল নির্বাচন কমিশন! গণতন্ত্রের উৎসবের নামে এমন প্রহসন সারাজীবনেও ভুলব না।’ -নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)