• গান্ধী-নেহরুর স্বপ্নের মৃত্যু আর ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির পতন, নানা বিতর্ক পেরিয়ে ৫০–এ ‘জন অরণ্য’
    এই সময় | ০১ মে ২০২৬
  • ‘আমি অন্য যে কারও চেয়ে, এমনকী মৃণাল সেনের চেয়েও বেশি স্পষ্ট ভাবে রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়েছি,’ সাফ জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। একটি পত্রিকার প্রশ্নের উত্তরে। নিউ ইয়র্কের মিউজ়িয়াম অফ মর্ডান আর্টে ভারতীয় সিনেমার এক ফেস্টিভ্যাল উপলক্ষে সেই সাক্ষাৎকারে যে-সিনেমা নিয়ে সত্যজিতের ওই দাবি, সেই ‘জন অরণ্য’ পঞ্চাশে পড়ল এ বার।

    ১৯৭৬-এ মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। সিনেমায় ক্ষমতাসীন দলের এক রাজনৈতিক কর্মী তার আগামীদিনের কাজ নিয়ে আলোচনা করে। সত্যজিৎ বলছেন, ‘সে আবোল-তাবোল বকে, মিথ্যা বলে, কিন্তু তার উপস্থিতিটাই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য কোনও পরিচালক যদি ওই ছবিটি বানাতেন, তবে ওই দৃশ্যটি ছাড়পত্র পেত না।’ তবু ‘জন অরণ্য’-ই শেষ। তার পরে আর ও রকম সোজাসুজি রাজনৈতিক ছবি বানাননি সত্যজিৎ। কিন্তু কেন? তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু একজন পরিচালক কী বলতে পারেন তার উপর নিশ্চিত ভাবেই কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। আপনি জানেন যে কিছু নির্দিষ্ট বিবৃতি এবং চিত্রায়ণ কখনও-ই সেন্সরের বাধা পার হবে না। তা হলে সেগুলো তৈরি করে লাভ কী?’

    অপু-দুর্গার অপার আশাভরা চোখ দিয়ে মানিক-ছবির যে যাত্রা শুরু, ‘জন অরণ্য’-র সোমনাথে এসে সেই আশা নিভে গিয়েছে। ষাট ও সত্তরের দশকের কলকাতা তখন অস্থির। নকশালবাড়ি আন্দোলন, বেকারত্ব এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে। সদ্য-স্বাধীন এক রাষ্ট্রের স্বপ্নভঙ্গও রয়েছে তার মর্মে। কলকাতা-ট্রিলজির শেষ ছবি ‘জন অরণ্য’-র পরে কলকাতার অন্ধকারতম দিকটি ছেড়ে সত্যজিৎ ঝুঁকলেন ক্ষয়ে যাওয়া মুঘল ইতিহাসে। মুন্সী প্রেমচন্দের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-তে। তার পরে এক ‘হীরক রাজার দেশে’ ছাড়া কোথাও রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কথা নেই।

    ১৯৭৬-এ মুক্তির পর ‘জন অরণ্য’ তীব্র বিতর্ক তৈরি করে। সমসাময়িক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং মার্কসবাদী সমালোচকদের একটা বড় অংশের অভিযোগ ছিল, সমাজের পচে যেতে থাকা চেহারাটা সত্যজিৎ দেখিয়েছেন, কিন্তু এর কোনও রাজনৈতিক বা বৈপ্লবিক সমাধান দেননি। সোমনাথের বাবার আক্ষেপ ছিল বেকার যুবকদের সামনে কেবল দু’টি পথ খোলা আছে— দুর্নীতি অথবা বিপ্লব। কিন্তু সোমনাথ সমাজ পাল্টানোর লড়াইয়ের বদলে দালালির সহজ অথচ পঙ্কিল পথ বেছে নেয়। বামপন্থীদের অভিযোগ ছিল, সত্যজিৎ বুর্জোয়া শ্রেণির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। গান্ধীর আদর্শ ও নেহরুর স্বপ্নের মৃত্যু এবং ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির পতন এ ছবির আর একটা বিতর্ক-কেন্দ্র ছিল। যে শ্রেণি এক সময়ে রেনেসাঁ বা নবজাগরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা আজ নিছক দালাল এবং মধ্যস্বত্বভোগীতে পরিণত হয়েছে, তীব্র ভাবে এটা দেখিয়েছিলেন সত্যজিৎ। ৫০ বছর পরে আজকের বাংলার জনারণ্যেও কি মিশে নেই অসহায় সোমনাথরা!

    —আশিস পাঠক
  • Link to this news (এই সময়)