এই সময়, আসানসোল: একসময়ে আসানসোল শিল্পাঞ্চলে মে দিবস মানেই ছিল শ্রমিক–কর্মচারীদের সারা দিনের উৎসব–অনুষ্ঠান। বাম, ডান সব শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগেই দিনটি কমবেশি উদযাপন করা হতো। সংগঠনের পতাকা তোলা থেকে বক্তৃতা, নাটক, গানে মেতে উঠতেন শ্রমিক কর্মচারীরা। কিন্তু সেই সব দিন আজ অতীত। তার পিছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে এই শিল্পাঞ্চলে শিল্পের অবনমন।
বস্তুত, ১৯৮০–র দশকে রুগ্ণ হতে শুরু করে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও কয়লাখনি। শেষ পর্যন্ত সেগুলি মুখ থুবড়ে পড়েছে। পাল্লা দিয়ে বন্ধ হয়েছে অনুসারি শিল্পগুলিও। পরিণতিতে বিরাট সংখ্যায় শ্রমিক–কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। পাশাপাশি নতুন শিল্প তৈরি না–হওয়ায় থমকে গিয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও নিয়োগের প্রক্রিয়া। এই অবস্থায় আসানসোল শিল্পাঞ্চলে ক্রমশ জৌলুসহীন হয়ে পড়েছে মে দিবস, শ্রমিক দিবসের প্রাসঙ্গিকতাও হারিয়ে যাচ্ছে বলে মত শ্রমিক নেতৃত্বের অনেকের। তবু টিমটিম করে হলেও দিন ফেরার আশায় আজও শিল্পাঞ্চল জুড়ে পালিত হয় মে দিবস।
গত কয়েক দশকে আসানসোল শিল্পাঞ্চলে বন্ধ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বার্ন স্ট্যান্ডার্ড, কুলটির ইস্কো, রূপনারায়ণপুরের হিন্দুস্তান কেবলস, সাইকেল কর্পোরেশন, আসানসোলের পিংক্লিন্টন কাচ কারখানা, জেকে নগর অ্যালুমিনিয়াম, বেঙ্গল পেপার মিল, চিনাকুড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কেশোরাম রিফ্র্যাক্টোরিজ়–সহ বেশ কয়েকটি অনুসারি শিল্পও। বন্ধ হয়েছে ইসিএল–এর মাউথডিহি ও চিনাকুড়ি কয়লাখনি। এ প্রসঙ্গে সিটু–র রাজ্য নেতা পার্থ মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘এ সব শিল্পে কর্মরত লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। ফলে তাঁরা এখন আর মে দিবস পালন করেন না। অন্য দিকে, বার্নপুরে ইস্কোর আধুনিকীকরণ, কুলটিতে ওয়াগন কারখানার নির্মাণ ও তিনটি বন্ধ কয়লাখনি–সহ কুলটি ইস্কোকে ঠিকা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া এই সময়কালের মধ্যে নতুন কোনও শিল্পোদ্যোগের দেখা মেলেনি। আবার নিয়োগ বলতে শুধুমাত্র ঠিকা প্রথায় নিয়োগ।’ পার্থ আরও বললেন, ‘এই পরিস্থিতিতে মে দিবসের প্রাসঙ্গিকতা সাধারণ শ্রমিকদের কাছে ফিকে হচ্ছে। কিন্তু হাল ছাড়লে হবে না। নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দাবিতে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই বিশেষ দিনটিকে শুধু শ্রমিক–কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না–রেখে ছড়িয়ে দিতে হবে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
আইএনটিইউসির অন্যতম কেন্দ্রীয় সম্পাদক হরজিৎ সিংও শিল্পাঞ্চলের হতশ্রী চেহারা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন। তাঁর কথায়, ‘গত প্রায় চার দশকে একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধ হয়েছে। গড়ে ওঠেনি নতুন শিল্পও। কার্যত ইস্কো কারখানার আধুনিকীকরণ ছাড়া আর কোনও বড় পুঁজি বিনিয়োগ হয়নি আসানসোল শিল্পাঞ্চলে। পাশাপাশি একের পর এক কয়লাখনি ঠিকা সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘দু’বেলা ভাত জোগাড় করতে শ্রমিক–কর্মচারীদের কালঘাম ছুটছে। এই অবস্থায় মে দিবস পালনের অবসর ও উৎসাহ কোনওটাই নেই তাঁদের। বর্তমান পরিস্থিতি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে মে দিবস এখন নিয়ম রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ তবুও অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোর খোঁজে শুক্রবার পালিত হবে মে দিবস।