• কারখানা নিয়ে হতাশা, রাজ্যে সবথেকে কম ভোট পড়ল চিত্তরঞ্জনে
    এই সময় | ০১ মে ২০২৬
  • এই সময়, আসানসোল: রাজ্যে প্রত্যেক দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সেখানে রাজ্যে সবথেকে কম ভোট পড়ল পশ্চিম বর্ধমানের বারাবনি কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত চিত্তরঞ্জন রেলশহরে, মাত্র ৭৪ শতাংশ। অথচ বারাবনি কেন্দ্রে সব মিলিয়ে ৯১.০৬ শতাংশ ভোটদাতা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে মত জানিয়েছেন। গোটা পশ্চিম বর্ধমান জেলাতেও ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশের বেশি।

    চিত্তরঞ্জনে এ বার বুথের সংখ্যা ছিল ৩১, মোট ভোটার ছিলেন ১১০১১ জন। তাঁদের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৮১৬৬ জন। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে ৬ নম্বর এরিয়ার ২৭ নম্বর বুথে, ৮১ শতাংশ। সেখানে ভোটার ছিলেন ৩২০ জন, ভোট দিয়েছেন ২৬০ জন। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে সুন্দর পাহাড়ি দু’নম্বর এরিয়ার ৮ নম্বর বুথে, ৬৫ শতাংশ। সেখানে ৩১৯ জনের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ২০৮ জন।

    স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, চিত্তরঞ্জনে এত কম ভোট পড়ল কেন? এই শহরে রেলের স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠন সিটু অনুমোদিত লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাজীব গুপ্ত বললেন, ‘এর অন্যতম কারণ, চিত্তরঞ্জন রেল কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা রেল মন্ত্রকের কাজকর্মে রীতিমতো হতাশ। সেই হতাশা থেকে অনেকেই ভোট দিতে যাননি।’ হতাশাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘এখানে পাঁচ হাজারের বেশি শূন্য পদ পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর। কারখানায় কাজের ৮০ শতাংশের বেশি আউটসোর্সিং করা হচ্ছে। তা নিয়ে আসানসোলের সাংসদ বা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেউ দেশের সংসদে বা রেল মন্ত্রকের কাছে কোনও উচ্চবাচ্য করেন না।’ সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের এই নেতা আরও বললেন, ‘কয়েক দিন আগে আসানসোলে এসে প্রধানমন্ত্রীও এই বিষয়ে কিছু বলেননি। ফলে ভোট দিয়ে কী হবে, এটা অনেকের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।’ কিছুটা হতাশার সুরে তাঁর সংযোজন, ‘এখানকার কমবয়সী ছেলেমেয়েদের অনেকেও একেবারেই আগ্রহী নয় ভোট দিতে। কারণ, তারা জানে, এখানে তাঁদের কোনও চাকরি হবে না।’

    চিত্তরঞ্জন রেল কারখানা নিয়ে সিটু–র নেতার এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হলেন এখানকার দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলশ্রমিক সংগঠন এনএফআইআর এবং কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিউসি–র সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রজিৎ সিং। তিনি বললেন, ‘কাজের আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন রেল কারখানায় স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমাতে কমাতে সাড়ে সাত হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমরা এখানকার তৃণমূলের সাংসদের সঙ্গে একাধিক বার দেখা করে কারখানার এই সব সমস্যার কথা জানিয়েছি। কিন্তু তাঁকে সংসদে এ নিয়ে সে ভাবে সরব হতে কোনও দিন দেখিনি।’ ইন্দ্রজিৎ আরও বললেন, ‘এখানে ভোটে আগ্রহ কমার আর একটি বড় কারণ, সংরক্ষিত শহর বলে সাংসদ বা বিধায়ক তহবিল থেকে চিত্তরঞ্জনে কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমতি দেওয়া হয় না। অনেকে ভাবেন, তা হলে সাংসদ বা বিধায়ক নির্বাচন করে লাভ কী! আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে দিল্লিকে বার বার জানিয়েছি, চিত্তরঞ্জন অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ছে।’

    কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেও দলের শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় রেল মজদুর সঙ্ঘের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি এবং চিত্তরঞ্জন রেল কারখানার কর্মী কৃষ্ণ মুরারি পান্ডেও ফাঁকা পদ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘চিত্তরঞ্জনে বহু বছর ধরে নতুন কোনও নিয়োগ হচ্ছে না। হাজার হাজার পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। তা ছাড়াও কর্মীদের আবাসনে ছাদ থেকে জল পড়ে, পানীয় জল দিনে একবার মাত্র দেওয়া হয়, নিকাশি ব্যবস্থাও বহু জায়গায় বিপর্যস্ত। এগুলো ভোট না–দিতে যাওয়ার অন্যতম কারণ।’ চিত্তরঞ্জনের বিজেপির মণ্ডল সভাপতি অভিষেক সিংয়ের মুখেও শোনা গেল, ‘ভোটে অনীহার পিছনে রয়েছে কারখানা নিয়ে কর্মীদের হতাশা।’

  • Link to this news (এই সময়)