• নদীর গর্ভে বিন্দু বিন্দু সোনায় ওঁরা পাড়ি দেন সংসারের সিন্ধু
    এই সময় | ০৩ মে ২০২৬
  • রথীন্দ্রনাথ মাহাতো, বান্দোয়ান

    খেপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর।

    আর ওঁরা খুঁজে আনেন সোনা!

    সদ্য মিটে যাওয়া ভোটের দু'দফা নিয়ে মাথা ঘামান না বিনোদ শবর, লক্ষ্মী শবর, সহদেব শবর, মণি শবররা। জানেন, কারও দিনবদলের আশ্বাসেই তাঁদের দিন বদলায় না। দু'মুঠো অন্নের সংস্থান করতে সারাটা দিন নদীর জলে ডুব দিয়ে বালি তোলেন ওঁরা। সেই বালিকে কাঠের পাটাতনে রেখে জলে ধুয়ে ছেঁকে তোলেন বিন্দুর মতো সোনার টুকরো। রোজ কি ভাগ্য সঙ্গী হয়? নাহ! তবু কপালজোরে সোনার মুখ দেখলে তা বিক্রি করেই চলে সংসার কোনওক্রমে।

    পুরুলিয়ার মানবাজার–২ ব্লক এলাকায় টটকো নদী সংলগ্ন বেশ কিছু গ্রামের বাসিন্দা এ ভাবেই বেঁচে থাকার মরিয়া লড়াইয়ে মগ্ন। স্ত্রীকে নিয়ে কয়েক দশক ধরে সোনা ছেঁকে তোলার কাজ করেন বোরোর শবরপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বিনোদ। কেন এই পেশায়? বিনোদের জবাব, 'হাতে কাজ তেমন নেই। অথচ পরিবার চালাতে অনেক খরচ। বাড়িতে বসে না–থেকে যদি কিছু টাকা উপার্জন করতে পারি, তাতে সংসারটা বাঁচবে। তাই বালি, মাটি ছেঁকে সোনার টুকরো খুঁজি। সপ্তাহে কয়েক হাজার টাকা এসে যায়।'

    টটকো নদী কবে থেকে এমন 'সোনার খনি' হয়ে উঠল?

    ঝাড়খণ্ডের দিক থেকে বয়ে এসেছে টটকো নদী। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ও বোরো এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ছুঁয়ে সেই নদী কংসাবতী জলাধারে মিশেছে। কয়েক দশক আগে এই নদীতে প্রচুর সোনা পাওয়া যেত। নদী নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল ওএনজিসি। কিন্তু পরিমাণ মতো সোনার খোঁজ না–পেয়ে সমীক্ষা হয়েছে বন্ধ। তার পরেও যেটুকু সোনা রয়েছে নদীতে, তারই খোঁজ চালান বিনোদ, মণিরা। বিনোদের স্ত্রী লক্ষ্মীর কথায়, 'বিয়ের পরে এখানে এসে জেনেছিলাম, নদীতে সোনা পাওয়া যায়। সেই সময় থেকেই কাঠের পাটাতন দিয়ে নদীর ভিতর থেকে বালি, মাটি তুলে ছেঁকে তুললে পাটাতনে বিন্দু বিন্দু সোনা মেলে। এক সময়ে এই নদীতে প্রচুর সোনার টুকরো পাওয়া যেত। এখন তা অনেক কম।' তার মধ্যেই বিনোদের মন্তব্য, 'মাসে দু'হাজার টাকা পেনশন পাই। কিন্তু জিনিসের যা দাম, তাতে ওই টাকায় সংসার কি চলে! সরকারি কাজও তো নেই। এই কাজে সপ্তাহে অন্তত কয়েক হাজার টাকা বাড়তি পাওয়া যায়।'

    সকাল হলেই কাঠের পাটাতন হাতে নিয়ে নদীর ধারে হাজির হন ওঁরা, গুপ্তধনের সন্ধানে! মণি বলছিলেন, 'তিন মেয়ে এবং এক ছেলেকে নিয়ে সংসার। এলাকায় ১০০ দিনের কাজ নেই। বছর পাঁচেক আগে ১০০ দিনের কাজ করেছিলাম, সেই টাকা এখনও পাইনি। তাই বাধ্য হয়েই নদীতে সোনার কুচি খুঁজে বেড়াই। যা পাই তাতেই লাভ।' আর এক বাসিন্দা সহদেবের এক কথা, 'কাজ পেলে সোনা খুঁজতে আসতাম না। খেটে কয়েক হাজার টাকা পেলে তা দিয়েই সংসার চলত।' সারাদিন জলে থেকে শরীরও মাঝেমধ্যে জবাব দেয়। কিন্তু পেটের টান বড় বালাই! শরীর খারাপ নিয়েই চলে সোনার খোঁজ!

    টটকোর খাতে গুপ্তধনের সন্ধান মেলে, জানেন অনেকেই। এলাকার ভুগোলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রমথনাথ মাহাতো বলছিলেন, 'ঝাড়খণ্ডের আনাচেকানাচে খনিজ ভাণ্ডার রয়েছে। টটকো নদীর উৎস পটমদা থানার গবরঘুষি এলাকায়। ও দিক থেকে বয়ে আসা অধিকাংশ নদীতে কমবেশি সোনা মেলে।' আঁকরো গ্রামের সোনার ব্যবসায়ী বাবলু দত্তের কথায়, 'আগে অনেক বেশি সোনা মিলত, তখন প্রচুর মানুষ নদীতে ভিড় করতেন। এখনও কিছু মানুষ আসেন। তবে আগের মতো সোনা মেলে না।'

    পরশপাথরের সন্ধান তো পাননি ওঁরা। তাই বিন্দু বিন্দু তুলেই সংসারের সিন্ধু পাড়ি দেন।

    হাজার হোক, সোনাই তো!

  • Link to this news (এই সময়)