• বেলেঘাটা থেকে বেহালা, ‘হাউস অ্যারেস্টে’ বহু ‘দাদা’, গন্ডগোল ঠেকাতে আগে থেকেই পুলিশের কড়া ‘অ্যান্টিবায়োটিক’
    এই সময় | ০৩ মে ২০২৬
  • সোমনাথ মণ্ডল

    রাজ্যে পরবর্তী সরকার কে গড়বে, রাত পোহালেই তার ফয়সালা হওয়ার কথা। ইভিএম যেখানে রাখা, সেই স্ট্রংরুমগুলো কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। কাল, ৪ মে ফল ঘোষণা হওয়ার পরে যে দলই সরকার গঠন করুক, কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় হিংসা ঠেকাতে আগে থেকেই ওষুধ দিতে শুরু করেছে পুলিশ–প্রশাসন। ওষুধ মানে একেবারে কড়া ডোজ়ের অ্যান্টিবায়োটিক।

    কী রকম অ্যান্টিবায়োটিক?

    লালবাজার সূত্রের খবর, প্রতিটি থানা এলাকায় কারা কারা গোলমাল করতে পারে, কাদের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস রয়েছে, তার তালিকা তৈরি করে একদিকে যেমন নতুন করে ধড়পাকড় শুরু হয়েছে, তেমনই আবার ‘বাহুবলী’–দের কাছে ঠারেঠোরে এই বার্তা পৌঁছে গিয়েছে যে, গোলমাল করে ধরা পড়লেই লকআপ। ভাঙড় থেকে বন্দর, সর্বত্র এই কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে পুলিশ। বেলেঘাটা থেকে বেহালা, অলিতে–গলিতে দাপিয়ে বেড়ানো ‘কেষ্টবিষ্টু’রা নিজেদের কার্যত ‘হাউজ় অ্যারেস্ট’ করে ফেলেছেন। পুলিশ–প্রশাসনের এমন কড়া পদক্ষেপ দেখে বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, ‘আগে যারা পুলিশকে দিনরাত চমকাত, তারাই এখন ঘরে ঢুকে গিয়েছে। এমনকী, নেতানেত্রীদের ফোন এলেও ঘরের চৌকাঠ পেরোতে ভয় পাচ্ছে তারা। পুলিশকে সমাজবিরোধী, দুষ্কৃতীদের তো এ ভাবেই ভয় পাওয়া উচিত।’

    দক্ষিণ শহরতলির বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটের আগে থেকেই বিজেপি ও তৃণমূল দফায় দফায় গোলমালে জড়িয়েছে। গত বুধবার, ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোট মিটতে না–মিটতেই পর্ণশ্রীর তৃণমূল নেতা অঞ্জন দাসকে বিজেপি বেধড়ক মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। তাঁর নাকমুখ ফেটে যায়। শনিবার পর্ণশ্রী থানার অফিসাররা ওই ঘটনায় জড়িতদের পাড়া ধরে ধরে চিহ্নিত করার কাজে নেমেছেন। কোথায় তারা? পুলিশের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের পরিবারের সদস্যদের। কাঁকুলিয়া রোডের গোলমালে অভিযুক্ত, কসবার সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দারেরও খোঁজ চলছে। এলাকায় তার শাগরেদদের মধ্যে গুঞ্জন, ‘দাদা কি আর বেরোবে না!’

    একই ছবি ধরা পড়েছে বেলেঘাটা–শ্যামপুকুর–কাশীপুর এলাকায়। সূত্রের খবর, কলকাতা পোর্ট বিধানসভা কেন্দ্রের ১০ জন ‘বাহুবলী’ বেশ কিছু দিন যাবৎ কার্যত ‘হাউজ় অ্যারেস্ট’ হয়ে রয়েছেন। আগে থেকেই তাঁদের উপরে নজর রেখেছিল পুলিশ। লালবাজারের এক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের কড়া নজর ছিল তাঁদের উপরে। তার ফলও ভোটের দিন, ২৯ এপ্রিল মিলেছে হাতেনাতে। একটি ইটও কেউ সেখানে ছুড়েছে, এমন অভিযোগ ওঠেনি। আবার, যে কোনও ভোটের সময়ে যে ভাঙড়ে খুন–জখম ও বোমাবাজি সমার্থক হয়ে উঠেছিল, কমিশনের কড়াকড়ি এবং পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তায় হিংসার পথে হাঁটতেই ‘সাহস’ করেনি সেই ভাঙড়ের ‘গোলমেলে’ লোকজন। তবে তাতে আত্মতুষ্টিতে না–ভুগে ফল ঘোষণার দিন ও তার পরেও ভাঙড়ের হাতিশালা, চালতাবেড়িয়া, প্রাণগঞ্জের মতো তল্লাট এখন ২৪ ঘণ্টা পুলিশের স্ক্যানারে।

    ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ফল বেরনোর পরে রাজ্যর বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক হিংসা ও খুনখারাপির ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তে নামে সিবিআই। তার পুনরাবৃত্তি যে হবে না, তার গ্যারান্টি দিতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই। ইতিমধ্যেই গোলমালের আশঙ্কায় নতুন করে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। ২০২১–এর কথা মাথায় রেখে গোয়েন্দা–তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি সেরে রাখছে কলকাতা পুলিশ।

    এ বার বিধানসভা ভোট ঘোষণা হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে কলকাতার পুলিশ কমিশনার হন অজয় নন্দ। তার পরে তিনি প্রতিটি ডিভিশনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে কখনও বাহিনীকে ‘ভোকাল টনিক’ দিয়ে, কখনও আবার কড়া পদক্ষেপ করার মধ্যে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, পুলিশের উর্দিতে তিনি দাগ লাগতে দেবেন না। লালবাজার সূত্রের খবর, ভোটের ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাহিনীর উদ্দেশে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বার্তা— কোথাও রাজনৈতিক হিংসা ও বোমাবাজি যাতে না–হয়, গুলি যাতে না–চলে, সেটা নিশ্চিত করতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক দলের হয়ে যারা গোলমাল পাকাতে পারে বলে বলে মনে হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে। কলকাতা পুলিশ সূত্রের খবর, এই বার্তার মধ্যে দিয়ে সিপি বোঝাতে চেয়েছেন, তিরে এসে তরী যেন না–ডোবে।

  • Link to this news (এই সময়)