এই সময়: একসঙ্গে গোটা বিধানসভা কেন্দ্রেই রিপোল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য এমনই বেনজির সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচন কমিশন। শনিবার রাতে কমিশন জানিয়েছে, এই কেন্দ্রের ২৮৫টি বুথেই আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন হবে। ফল গোষণা হবে আগামী ২৪ মে। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের মাত্র ৩৬ ঘণ্টা আগে একটি গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে সব বুথে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বাংলায় অন্তত সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি বলে দাবি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। গত বুধবার বঙ্গে দ্বিতীয় দফায় ভোটের দিন ফলতার অনেকগুলি বুথে কোথাও ইভিএমে টেপ লাগানো বা কোথাও আতর মাখানোর মতো অভিযোগ উঠেছিল। একই অভিযোগ ওঠে ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট পশ্চিম ও বজবজের কিছু বুথেও। তার মধ্যে ডায়মন্ড হারবারের ৪টি ও মগরাহাট পশ্চিমের ১১টি বুথে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ শুক্রবারই জারি করেছিল কমিশন। শনিবার সেই রিপোল শান্তিপূর্ণ ভাবেই মিটেছে। তবে ফলতার বিষয়টি কমিশন ঝুলিয়ে রেখেছিল। এ দিন রাতে অবশেষে গোটা বিধানসভাতেই নতুন করে ভোটগ্রহণের নির্দেশ জারি করল কমিশন।
বাংলায় প্রথম পর্বের নির্বাচনে ১৬টি জেলার ১৫২টি কেন্দ্রের একটি বুথেও রিপোল বা পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেনি কোনও রাজনৈতিক দল। তবে দ্বিতীয় দফায় সাতটি জেলার ১৪২টি কেন্দ্রের মধ্যে ডায়মন্ড হারবার, মগরাহাট পশ্চিম, ফলতা ও বজবজের বেশ কয়েকটি বুথে কোথাও ইভিএমের বাটনে সেলোটেপ বা ব্ল্যাকটেপ, কোথাও বা আতর লাগানোর অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের সামনে আসে। এই কেন্দ্রগুলিতে রিপোলের দাবি খতিয়ে দেখার জন্য দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে রাজ্যে নিযুক্ত বিশেষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত নিজে ডায়মন্ড হারবারে গিয়ে স্ক্রুটিনি সারেন। তাঁদের তরফ থেকে একটি রিপোর্টও পাঠিয়ে দেওয়া হয় দিল্লিতে কমিশনের দপ্তরে।
কেন এই বেনজির নির্দেশ?
কমিশনের বক্তব্য, গত ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বেশকিছু বুথে ইভিএমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বোতামের উপরে ব্ল্যাকটেপ বা আতর লাগানোর অভিযোগ আসে। তা ছাড়া ওই কেন্দ্রের ভোটারদের ভয় দেখানো, বুথের মধ্যে কোনও একটি রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের বেআইনি উপস্থিতির অভিযোগও উঠেছে। সেই সব অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ পর্যবেক্ষক নিজে সেখানকার বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র নিজে ঘুরে দেখেন। দেখেন ভিডিয়ো ফুটেজও। স্পেশাল অবজ়ার্ভারের স্ক্রুটিনি রিপোর্ট দেখে কমিশন এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা জেনারেল অবজ়ার্ভার শুধুমাত্র প্রিসাইডিং অফিসারদের নোটের উপরে ভরসা করেছিলেন। কিন্তু ভোটের আসা দেদার অভিযোগ ও বুথের সিসিটিভি ফুটেজ তাঁরা পরীক্ষা করেননি। কমিশনের নজরে এসেছে, রিটার্নিং অফিসার যে ভিডিয়ো ফুটেজ চিপে ভরে জমা দেন, তার অনেকগুলি ছিল ফাঁকা। কোথাও আবার বিহারের কোনও বুথের ভোটের রেকর্ডিং মিলেছে। কমিশনের সন্দেহ, পরিকল্পনামাফিক এই সব বুথের ভিডিয়ো ক্যামেরা হয় অফ করা হয়েছে অথবা সেই রেকর্ডিং সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্তত ৩৪টি বুথের ভিডিয়ো ফুটেজ হয় মেলেনি বা বিকৃত করা হয়েছে, কোনও বুথে নির্দিষ্ট সময়ের ফুটেজ মেলেনি, কোথাও একাধিক ভোটারকে একসঙ্গে ইভিএম কাউন্টারে ঢুকতে দেখা গিয়েছে, কোথাও বুথের মধ্যে প্রচুর অবাঞ্ছিত লোকের ভিড় দেখা গিয়েছে। এতকিছুর পরেও সংশ্লিষ্ট জেনারেল অবজ়ার্ভার ও রিটার্নিং অফিসার অভিযোগকারী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে না–ডেকেই স্ক্রুটিনি করেছিলেন। কমিশনের দাবি, এই কেন্দ্রের মোট বুথের অন্তত ২১ শতাংশ ও মোট ভোটারের অন্তত ২২.৮২ শতাংশ যেখানে প্রভাবিত হয়েছেন, সেখানে গোটা কেন্দ্রেই নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। যেখানে ইভিএমে টেপ লাগানোর ঘটনা ভোট চলাকালীন ধরাও পড়ে, সেখানে তার আগেই সর্বোচ্চ ৫৮ শতাংশ ভোট হয়ে গিয়েছিল। কমিশনের এই রিপোলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের প্রতিক্রিয়া, ‘ঘটনা খতিয়ে দেখে পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিক। আইন আইনের পথেই চলবে।’
এর আগে শনিবার ডায়মন্ড হারবার ও মগরাহাট পশ্চিমের দুই কেন্দ্রের ১৫টি বুথে সন্ধে ৬টা পর্যন্ত গড়ে ৯০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে বলে কমিশন সূত্রের দাবি। গত ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন মগরাহাট পশ্চিমে গড়ে ভোট পড়েছিল ৯৪.১৯ শতাংশ এবং ডায়মন্ড হারবারের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯৪.২৬ শতাংশ। সেই হার রিপোলে টপকে যাবে কি না, সেটার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ দিনও বুথগুলিতে কড়া নিরাপত্তার বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল। ফলে অশান্তির কোনও খবর আসেনি।
তবে ফলতায় এ দিন রিপোল না–হলেও সেখানে রাজ্যের শাসকদলের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়দের অনেকে। এই অভিযোগে ফলতার হাসিমনগরে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান গ্রামবাসীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, গত বুধবার তাঁদের ভোটদানে বাধা দিয়েছে তৃণমূল। হুমকি দিচ্ছেন তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধান ইসরাফিল চাকদার। ভোটের ফল ঘোষণার পরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ। এ দিন বিক্ষোভ চলাকালীন উল্টে পুলিশ তাঁদের উপরেই লাঠিচার্জ করে বলে দাবি গ্রামবাসীদের। বিক্ষোভকারী এক মহিলার দাবি, ‘অত্যাচারের মধ্যেও কোনওমতে ভোট দিয়েছি। আমরা নিরাপত্তা চাই। বাড়ি বাড়ি কেন থ্রেট দেওয়া হবে?’ কেউ কেউ আবার এই কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের দাবিও জানান। এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। ধৃতদের নাম, হাবিব মোল্লা, আতিবুর রহমান ও হাবিব শেখ। পঞ্চায়েত প্রধান ইসরাফিল ও সুজাউদ্দিন শেখ নামে দু’জনের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সরব হয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইসরাফিল। তিনি বলেন, ‘আমি কাউকেই হুমকি দিইনি। বিজেপি চক্রান্ত করে আমাকে ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ফাঁসাচ্ছে। পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন তদন্ত করলে সত্যিটা প্রকাশ্যে চলে আসবে।’