• উত্তর, রাঢ় ও দক্ষিণবঙ্গ, তিন বলয়ের অঙ্ক পদ্মের
    আনন্দবাজার | ০৩ মে ২০২৬
  • রাত পোহালেই বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসতে শুরু করবে। রাজ্য বিজেপির অন্দরে নানা স্তরে নানা অঙ্ক কষা চলছে ফলাফল নিয়ে। প্রায় সব অঙ্কই ‘ইতিবাচক’ ফলাফলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজ্য বিজেপি সূত্রের খবর, রক্ষণশীল হিসেব ধরলেও বিজেপির পক্ষে ১৫৫ থেকে ১৬৫টি আসন থাকতে পারে। তবে আগ্রাসী হিসেবে সেই আসন ১৭০ থেকে ১৮০-তে পৌঁছতে পারে। রাজ্য বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘‘যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া যায় বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না, তা হলেও ১২৫ থেকে ১৩৫টি আসনের নীচে থামানো অসম্ভব। তা হলেও সরকার গড়ার সম্ভাবনা খোলা থাকবে।’’

    রাজ্য বিজেপির ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা একাধিক সমীক্ষক সংস্থার সঙ্গে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জেলাওয়াড়ি ফলাফলের একটা আভাস পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি স্তর থেকে আসা কিছু তথ্য। বিজেপি সূত্রের দাবি, কালিম্পং, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ারের মতো জেলাগুলিতে বিজেপি নিরঙ্কুশ জিততে পারে। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দক্ষিণ ও উত্তর দিনাজপুর এবং মালদহে অতীতের চেয়ে ভাল ফলাফল হবে। রক্ষণশীল হিসেবে বিজেপি উত্তরবঙ্গ থেকেই ৩৬ থেকে ৩৮টি আসন পেতে পারে। আগ্রাসী হিসেবে সেটা অন্তত ৪২ থেকে ৪৫।

    বিজেপি সূত্রের হিসেব, দলের ভাল ফল হবে রাঢ়বঙ্গে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে ‘বিপুল’ সাফল্য আসতে পারে বিজেপির ঝুলিতে। সেই সঙ্গে অতীতে ভাল ফল করা পূর্ব মেদিনীপুরেও একচ্ছত্র দাপট রাখতে পারে বিজেপি। খাতা খুলতে পারে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, কলকাতায়। বড় চমক হতে পারে হুগলি, দুই ২৪ পরগনা এবং বীরভূমে। দক্ষিণে ২৪ পরগনায় বিজেপি খাতা খুলতে পারে এবং হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা ও বীরভূমে তৃণমূলকে সমানে-সমানে টক্কর দেওয়ার পরিস্থিতি আছে বলে বিজেপি শিবিরের দাবি।

    তবে এ বার আর ‘হাওয়া’য় দাবি করছেন না বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের যুক্তি, মাটির সংগঠনের বাস্তবতার উপরে নির্ভর করেই ভাল ফল হবে। বিজেপির যুক্তি, নারী শক্তিকে এ বার বিশেষ ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ‘সঙ্কল্প পত্রে’ মহিলাদের তিন হাজার টাকা মাসিক সুবিধার কথা শুধু বলা হয়নি। সেই সঙ্গে প্রচারকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ করে তোলার জন্য ‘মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড’ বিলি করা হয়েছে। তাতে নানা জায়গায় শাসক দলের দিক থেকে বাধা পেতে হয়েছে। ফলে, ওই প্রচার যে মহিলাদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকেই আক্রমণ বলে বিজেপি নেতৃত্বের মত। সেই সঙ্গে মাতৃত্বকালীন সময়ে পুষ্টি সামগ্রী প্রদান এবং ২১ হাজার টাকা সহায়তা, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩৩% সংরক্ষণ এবং সরকারি যানবাহনে বিনামূল্যে যাতায়াতের বিষয়গুলোও মহিলাদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পেরেছে বলে মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।

    বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্টই বুঝেছিলেন যে, নিচু তলার সংগঠন মেরামতি না-করলে নির্বাচনে জয় সম্ভব নয়। তাই যতটা সম্ভব ‘জল-হীন’ বুথ কমিটি তৈরি করা হয়েছে। সময় লেগেছে কিন্তু সেই কাজ যথাসম্ভব নিখুঁত করা গিয়েছে বলে দাবি বিজেপি নেতৃত্বের। এর পরে রাজ্য জুড়ে পথসভা, উঠোন বৈঠক করে ‘বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই’, এই স্লোগান মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পরের ধাপে ১৫ জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিজেপি বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক চার্জশিট পেশ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তত ২২০টি বিধানসভা এলাকা ছোঁয়া গিয়েছে। প্রায় দেড়শো রাজ্য নেতা এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    ঠিক তার পরেই ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত রাজ্য জুড়ে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র ডাক দিয়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন বিজেপি নেতৃত্ব। আপাত ভাবে এই কর্মসূচি সফল মনে না হলেও ১৪ মার্চের ব্রিগেড কর্মসূচির ভিড় সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে দিতে পেরেছে বলে দলীয় নেতাদের মত।

    শেষ পর্বে বিজেপি নির্বাচনী প্রচারকে কার্যত সপ্তমে পৌঁছে দিয়েছিল। এর পাশাপাশি, নিচু তলার কর্মীদের নির্বাচনী কাজে পুরোমাত্রায় নামাতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। তাঁদের কাজে সহায়তা এবং যে কোনও প্রয়োজনে আলাদা, পেশাদারি কায়দায় সহায়ক দল রাখা হয়েছে। ছিলেন ভিন্ রাজ্যের নেতারাও। তাঁরা পিছন থেকে গোটা প্রক্রিয়া সাজিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এর ফলে নির্বাচন করানোর প্রক্রিয়ায় দল অনেকটা এগোতে পেরেছে বলেই দাবি বিজেপি নেতৃত্বের।

    নির্বাচনের দিন বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ থেকে সরকার-বিরোধিতার ইঙ্গিত স্পষ্ট বলে মত বিজেপি নেতৃত্বে। এর আগে রাজ্যে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার ছিল ২০১১ সালে এবং সে বার ‘পরিবর্তন’ হয়েছিল। অতিরিক্ত ভোট তাই প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ভোট বলেই মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।

    মহিলা সমর্থন, সংগঠন ও বিপুল ভোটদান—এই তিন বিষয়কে একত্রিত করেই এ বার সরকার বদলের বিষয়ে প্রত্যয়ী পদ্ম শিবির। রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘আর জি কর আন্দোলন দিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যে গণ-বিস্ফোরণ শুরু হয়েছিল, তা গণ-প্রত্যাখ্যানে রূপান্তরিত হয়েছিল যুবভারতীতে মেসি-কাণ্ডে। আর এই নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে গণভোট হয়েছে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)