শেষ পুরভোট ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটের শতাংশ হার বেড়েছিল। প্রচারে সাড়া জাগিয়েও দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ বার বাম ভোট কোথায় দাঁড়াবে? আসনের খাতা খুলবে কি? যুযুধান দুই প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি-সহ গোটা রাজনৈতিক শিবিরেরই নজর এখন সেই দিকে!
রাজ্যে এ বার ১৯৫টি বিধানসভা আসনে লড়ছে সিপিএম। যা গত দুই বিধানসভা নির্বাচনের চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে বামফ্রন্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ২৫২টি আসনে। তাদের সহযোগী হিসেবে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) ৩০টি, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন ৮টি এবং অন্যান্য দল চারটি কেন্দ্রে লড়ছে। প্রচার-পর্বে বেশ কিছু কেন্দ্রে বাম এবং আইএসএফ প্রার্থীরা চোখে পড়ার মতো ভিড় টেনেছেন, মানুষের সাড়া পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কত ভোট বামেদের বাক্সে গিয়েছে, তার উপরে নির্ভর করতে হচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপি, দু’পক্ষকেই। সাধারণ হিসেবে, বামেরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভোট পেলে কোথাও বিজেপি, কোথাও তৃণমূলের যাত্রাভঙ্গ হবে। তবে রাজ্যে তৃণমূল যে হেতু সরকারে, তাই তৃণমূল-বিরোধী ভোটের ভাগই বামেদের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনা আঁচ করেই বামেদের ভোট নিজেদের দিকে টেনে আনার জন্য সব রকমের আবেদন-কৌশল প্রয়োগ করেছে বিজেপি। তৃণমূলের এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘এ বারের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বেশ কিছু কেন্দ্রে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এবং সেখানে বাম ভোট নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।’’
দুই দফার ভোট শেষে জেলাভিত্তিক রিপোর্টের প্রেক্ষিতে সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের আশা, দীর্ঘ ও ধারাবাহিক রক্তক্ষরণের পরে ছাব্বিশের চাকা উল্টো দিকে ঘুরবে। সার্বিক ভাবে ভোটপ্রাপ্তির রেখচিত্র এ বার ঊর্ধ্বমুখী হবে বলেই তাঁদের আশা। সেই সঙ্গে আসন জয়ও সম্ভব বলে তাঁরা মনে করছেন। সূত্রের খবর, উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘি, মালদহের মানিকচক ও হরিশ্চন্দ্রপুর, মুর্শিদাবাদের রানিনগর, ডোমকল ও জলঙ্গি, উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি, কামারহাটি ও দমদম উত্তর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার যাদবপুর, হুগলির উত্তরপাড়া, চন্দননগর ও পান্ডুয়ার মতো আসনে সিপিএম ভাল রকম লড়াইয়ে আছে বলে দলীয় রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। তার পাশাপাশি, খড়গ্রাম, দুর্গাপুর পূর্ব ও পশ্চিম, পূর্বস্থলী উত্তর, বড়জোড়া, সোনামুখী, পাড়ার মতো কিছু কেন্দ্রে সিপিএমের ভোট বৃদ্ধির সুযোগ আছে। সেই সঙ্গেই বসিরহাট উত্তর, স্বরূপনগর, মিনাখাঁ, দেগঙ্গা, ভাঙড়, ক্যানিং পূর্ব-সহ আরও কিছু আসনে আইএসএফ-বাম জোট ভাল ভোট পেতে পারে বলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের হিসেব। এই সমস্ত আসনের মধ্যে থেকেই ‘শূন্যের গেরো’ কাটানোর রসদ মিলবে বলে সিপিএমের আশা।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের মতে, ‘‘আমাদের সংগঠন মোটামুটি সক্রিয় এবং সেই সঙ্গে কিছু পরিমাণ সংখ্যালঘু ভোট আছে— সাধারণ ভাবে এই ধরনের আসনে এ বার ভাল সাড়া মিলেছে। সংখ্যালঘু ভোটের যে অংশ তৃণমূলে গিয়েছিল, তার একটা ভাগ এ বার ফিরে আসবে বলেই মনে হচ্ছে। আবার বিজেপির দিকে চলে যাওয়া ভোটের একটা অংশও ফিরবে। সার্বিক ভাবে বামেরা ১২-১৪% ভোট পেতে পারে বলে আশা করা যায়। আমাদের ভোট যেখানে যেমন বাড়বে, তার ফলে এলাকা অনুযায়ী তৃণমূল ও বিজেপি, দু’পক্ষই ধাক্কা খাবে।’’ সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের বেশ কিছু প্রার্থীই এ বার নজর কেড়েছেন। কলকাতা ও আশেপাশের এলাকার মধ্যে দমদম উত্তরে দীপ্সিতা ধরের দিকে বিশেষ করে নজর রয়েছে বাম শিবিরের। অল্প সময়ে অন্য জেলার নতুন কেন্দ্রে এসে দীপ্সিতা তাঁর প্রচারের আঙ্গিকে যে ভাবে সাড়া ফেলেছেন, শাসক দলের মহিলা ভোটেও তিনি চিড় ধরাতে পারেন বলে সিপিএমের একাংশের আশা। আর উত্তরপাড়ায় মাটি কামড়ে পড়ে থেকে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় আগে থেকেই আশার প্রদীপ জ্বেলে রেখেছেন।
এরই পাশাপাশি কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা থাকলে বিজেপি ও তৃণমূলের বিকল্প দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনেকটা এগিয়ে থাকা যেত, সেই আলোচনাও উঠে আসছে সিপিএমের অন্দরে। কংগ্রেস এবং আইএসএফের সমর্থনের নিজস্ব ‘পকেট’ রয়েছে। ফলে, অন্যত্র শক্তিশালী না-হয়েও তাদের আসন জয়ের সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি থেকে যায়। মূলত উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদের কিছু আসনের ভরসায় খাতা খোলার আশায় আছে কংগ্রেসও। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের দাবি, ‘‘বাস্তব পরিস্থিতি ও সময়ের দাবিতে দীর্ঘ দিন বাদে কংগ্রেস এ বার বিধানসভায় একা লড়েছে। ফল প্রকাশের পরে বোঝা যাবে, রাজ্যের রাজনীতিতে কংগ্রেস প্রাসঙ্গিক।’’
বামের ভোট বাড়বে ও আসন আসবে দাবি করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও বলছেন, ‘‘প্রচারে এ বার বিজেপি ও তৃণমূলের দ্বিমেরু ভাষ্য ভেঙেছে। কেউই জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত নয় বলে দু’পক্ষ নানা রকম দাবি করছে। প্রশাসনিক যন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, ধর্মীয় ভাবাবেগ-সহ সব রকমের উপাদান তারা ব্যবহার করেছে। আমাদের লড়াই বাংলা বাঁচানোর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজের জরুরি দাবিতে আমাদের তরুণ প্রজন্ম লড়ছে। সেই লড়াই ভোটের পরেও চলবে।’’
বস্তুত, ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রজন্ম তৈরি থাকা ভোটের শতাংশের চেয়েও সিপিএমের বেশি প্রাপ্তি!