সারাজীবন সন্তান পাশে থাকবে এটা ভাবা ভুল, আমি কখনও আশা করি না নীল বুড়ো বয়সে আমাকে দেখবে: অঞ্জন
আনন্দবাজার | ০৩ মে ২০২৬
প্রশ্ন: ‘প্রত্যাবর্তন’ ছবিতে বাস্তবের কাহিনি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যস্ত কর্মজীবন এবং পরিবার— দুই দিক সমান ভাবে বজায় রাখা কি সম্ভব?
অঞ্জন: ভীষণ ভাবে সম্ভব। দু’দিক ‘ব্যালান্স’ করে চলা যে কঠিন, এটা ভুল কথা। প্রচুর এমন মানুষ দেখেছি। আসলে কে কী ভাবে নিজের জীবনে বাঁচছে তার উপরে অনেকটা নির্ভর করে। কিছু কিছু মানুষের এটা হয়ে যায়। আমার চরিত্রটা এই ছবিতে অবশ্য পয়সার অন্য পিঠ।
প্রশ্ন: ২০২৫-এর সেই প্রথমে মুক্তি পেয়েছিল ‘এই রাত তোমার আমার’। তার পরে ‘প্রত্যাবর্তন’। এক বছরের বেশি সময় কেটে গেল...
অঞ্জন: সমর্পণ সেনগুপ্ত, মানে আমাদের পরিচালক যখন এই চরিত্রটা নিয়ে আমার কাছে আসে তখন বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পুরুলিয়ার গ্রামের স্কুলের মাস্টার। আমার ব্যক্তিত্বের থেকে একেবারে আলাদা। জানি না, দর্শকের কেমন লাগবে। এখন তো আসলে ডাবিংয়ের সময়েও পুরো ছবি দেখানো হয় না। ছবি মুক্তির আগেও পুরো ছবি দেখানো হয় না।
প্রশ্ন: ছবিতে দেখানো হয়েছে, পুরুলিয়ার স্কুল মাস্টারের ছেলে কলকাতায় সফল পেশাদার। বাবার সঙ্গে কোনও একটি বিষয় নিয়ে সংঘাত রয়েছে। আপনার সঙ্গে ছেলে নীলের সম্পর্ক ঠিক কেমন?
অঞ্জন: দেখুন, আমি কোনও দিন এই আশায় নীলকে বড় করিনি যে বুড়ো বয়সে ও আমাকে দেখবে। এই আশা কখনও আমি করি না। আমি যে সব মানুষের সঙ্গে মিশেছি তাঁদের থেকেও এই ধরনের কোনও মন্তব্য শুনিনি। মৃণালদাকে (সেন) তো কুণাল নিয়ে গিয়েছিল আমেরিকায়। মৃণালদা তো থাকতেই পারেননি। ‘বাজে দেশ, থাকা যায় না’ বলে ফিরে এসেছিলেন। মা-বাবাদের একটা ভুল হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
প্রশ্ন: কী ভুল?
অঞ্জন: অনেক মা-বাবা রয়েছেন, তাঁরা মনে করেন সারাজীবন ছেলেমেয়েরা তাঁদের সঙ্গে থাকবেন। এটা তো ভেবে নেওয়াও ভুল। আমি এমনই মনে করি। বিশ্বাস করি, যত দিন আছি নিজের মতো থাকব। নীল তার পরে যা করবে, সেটা ওর ব্যাপার। নীল বড় হয়ে আমাকে দেখবে, এটা আমি জীবনে কোনও দিন ভাবতে পারিনি। তবে এই ছবিতেও আমার চরিত্র যে এমন কোনও আশা করেছে তেমন নয়। ‘প্রত্যাবর্তন’-এ অভিনয় করতে গিয়ে একটা জিনিস খুব মিস্ করেছি।
প্রশ্ন: কী মিস্ করেছেন?
অঞ্জন: আগে কোনও ছবি তৈরি হলে প্রত্যেক সদস্য নিবিড় ভাবে যুক্ত থাকতেন ছবি তৈরির প্রক্রিয়ায়। সেটা সত্যিই কমে গিয়েছে। খুব আফসোস হয়। আমি এখনও সেই প্রক্রিয়াতেই কাজ করি। অনেকের সঙ্গেই ইদানীং কাজ করলাম, যাঁরা আর কোনও ওয়ার্কশপ করতে চান না। ইদানীং বললে অবশ্য ভুল বলা হবে। আমি তো প্রথমেই বুঝে গিয়েছিলাম, বাংলা বাণিজ্যিক ছবির অংশ হতে পারব না আমি।
প্রশ্ন: আপনি তো অভিনেতা হতেই চেয়েছিলেন বলে শুনেছি।
অঞ্জন: হ্যাঁ। অভিনেতা হতে এসেছিলাম। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বাদল সরকারের কাছে অভিনয় শিখেছিলাম। ভেবেছিলাম, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরেই আমার নাম হবে। কিন্তু ১৯৮০’র শেষে আমি যে সময়ে এসেছি, তখন বুঝেছিলাম, বাণিজ্যিক ঘরানার বাংলা ছবি আমার জন্য নয়। তখন যে সব ছবি তৈরি হত, সেগুলোর সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারি না। দেখতেও যাই না। ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’, ‘বাবা কেন চাকর’ — এই ধরনের ছবি দেখব কেন? বুঝেছিলাম, আমার দ্বারা হবে না, তার পরে আমি পরিচালনায় আসি।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের পরিচালক, অভিনেতাদের মধ্যে কে প্রিয় আপনার?
অঞ্জন: সৃজিত (মুখোপাধ্যায়), কৌশিকের (গঙ্গোপাধ্যায়) কাজ আমার ভাল লাগে। এরাই আমাকে অভিনেতা হিসাবে সিরিয়াসলি নিয়েছে। আসলে বর্তমান প্রজন্মের গুটিকয়েক লোকই আছেন যাঁদের সঙ্গে কাজ করে পরিবারসুলভ অনুভূতি আসে। আমি শুধুমাত্র মানিয়ে নিয়েছি।
প্রশ্ন: মানিয়ে নিয়েছেন মানে কি জোর করে সবটা করার চেষ্টা করছেন?
অঞ্জন: এক জন পেশাদারকে যেমন যে কোনও পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হয়, আমি ঠিক সেটাই করেছি। মানে, আগে আমরা যখন ছবি তৈরি করতাম, তখন প্রথমে মহড়া হত শুটিংয়ে যাওয়ার আগে। ফ্লোরে যাওয়ার আগে পুরো চিত্রনাট্য দেওয়া হত। এখন কোনওটাই হয় না। আমি এক, দু’বার বলি মহড়ার কথা। যাঁদের মনে হয় এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা আমার কথা শোনেন। আর যেখানে বুঝি তাঁরা চাইছেন না, সেখানে কোনও কথা বলি না। নিজের চরিত্রটুকু করে চলে আসি। আসলে এখন আর সবার মধ্যে সেই নিবিড় সংযোগটা পাই না। যে যার নিজের চরিত্রটুকু করে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। মোবাইল নিয়ে বসে পড়ে। এখন তাই অভিনয় করলে পরিচালক যা বলেন সেটা শুনে নিজের কাজ করে চলে আসি।
প্রশ্ন: এই যে শোনা যায়, আপনার মাথাগরম, আপনি নাকি খামখেয়ালি গোছের মানুষ?
অঞ্জন: লোকে ভাবে অঞ্জন দত্ত এসে চেঁচামেচি করবে। মাথা গরম করে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু কেন করব? মোটেই কিছু বলতে যাই না। কৌশিক ‘পালান’-এর সময়ে যা করতে বলেছিল তাই করেছিলাম। ‘নির্বাক’-এর সময়ে সৃজিত যেটুকু বলেছিল সেটাই করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করি, খারাপ সিনেমাতেও শিল্পী চাইলে ভাল অভিনয়, ভাল কাজ করতে পারে। তা বলে আমি বলছি না যে, আমি ভাল অভিনেতা।
প্রশ্ন: আপনি ভাল অভিনেতা নন, এটাই বলতে চাইছেন?
অঞ্জন: নই তো। আমি ভাল অভিনেতা কী করে হব? যখন আমি বলতাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরেই আমার নাম হবে। তখন অনেকই হাসত। আমাকে এক বার সৌমিত্রদা বলেছিলেন, “অঞ্জন, তুই বোঝার চেষ্টা কর। আমি যখন অভিনয় করতে এসেছি, তখন কত জন ভাল পরিচালক ছিলেন। তপন সিংহ, অজয় কর, অসিত সেন, মৃণাল সেন — কত বড় বড় পরিচালক। তুই কাকে পেয়েছিস? গোটা তিনেক ভাল পরিচালককে। কী করে করবি? তা হলে তো তোকে লিপস্টিক মেখে দৌড়োদৌড়ি করতে হয়। ভাল অভিনেতা হয়ে কি করবি সেটা?” এই কথাটা কানে বাজে আমার। এখন তো আবার সমাজমাধ্যমের যুগে আরও সমস্যা।
অঞ্জন: পরিচালকেরা নিজেদের সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়াই নিতে চান না। কেউ সমালোচনা নিতেই পারে না। আরে, আমরা তো সহকর্মী, বলব না? আমাদের মধ্যে তো আলোচনা হতেই পারে। সবাই চিত্রনাট্য নিজের বুকের কাছে আগলে রেখেছে। পুরো গল্প বলতেই চায় না। আমি কি চুরি করে নেব? অদ্ভুত! শুধু আমার চরিত্রটুকু শোনাবে। এ রকম কেন হয়ে গিয়েছে? আসলে পরিচালকেরা কারও কথা শোনে না, শুধু প্রযোজক ছাড়া। প্রযোজককে খুশি করতে পারলেই হল। কত টাকা উঠল। কত বার ‘অলমোস্ট হাউসফুল’ হল — এটাই করে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: বাংলা ছবির ব্যবসার হিসাব কি আদৌ জানা যায়?
অঞ্জন: প্রচুর গরমিল আছে। আগের দিনই দেখলাম লিখেছে ‘অলমোস্ট হাউসফুল’। এটা আবার কী? ‘সাকসেস পার্টি’ হচ্ছে। কীসের সাকসেস, কেউ জানে না। শুটিং করছি, তার মাঝে পোস্টারের ছবি তোলা হচ্ছে। এডিট হওয়ার আগে পোস্টারের ছবি উঠছে। অদ্ভুত লাগে। এই জন্য ছবির অবনমন হচ্ছে।
প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে অনেক আলোচনা হয়েছে এই কয়েক দিনে। শিল্পীদের ‘ব্যান’ করা নিয়ে বৈঠক হয়েছে। এত কিছুর মধ্যে আপনাকে কোথাও দেখা যায় না। কেন?
অঞ্জন: আমি এই সবকিছু এড়িয়েই চলি। দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের পরিবারের ভিতরের বিষয়। আনন্দবাজারের অফিসের মধ্যে কার সঙ্গে কার ঝগড়া হচ্ছে, এটা বাইরের মানুষ জানবে কেন? দর্শক এখন সবকিছুই জেনে ফেলছে। তা নিয়ে মন্তব্য করছে। ইন্ডাস্ট্রির বিষয়, তা তো নিজেদের মধ্যেই থাকার কথা। এত রাজনীতি ঢুকে গিয়েছে!
প্রশ্ন: কোন রাজনীতির কথা বলছেন?
অঞ্জন: আমি পার্টি-পলিটিক্সের কথা বলছি। রাজনীতি যদি শিল্পের মধ্যে ঢুকে যায়, তো খুবই সমস্যার। সবাই রাজনীতি করছেন। গায়ক, লেখক, কবি, অভিনেতারা সবাই কেন রাজনীতি করছেন? সেই রাজনীতির কোন্দলও ঢুকে পড়ছে ইন্ডাস্ট্রিতে। কোনও মানে নেই। খুব খারাপ হচ্ছে।
অঞ্জন: নিজের টাকায় একটা ছবি তৈরি করেছি। এটা বাদল সরকারের শতবর্ষ চলছে। বাদল সরকারই আমাকে অভিনয় করতে শিখিয়েছিলেন। তখন আমার ১৯ বছর বয়স। এক বছর ওঁর কাছে শিখেছিলাম অভিনয়। তাঁর উপরে একটি ছবি তৈরি করেছি। যেখানে বাদল সরকার আর অঞ্জন দত্তের চরিত্র দর্শক দেখবেন। ছোট অঞ্জনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রীকান্ত আচার্যের ছেলে পূরবশীল আচার্য। নিজে তৈরি করেছি। লাভের আশা করছি না। যেটুকু বিনিয়োগ করেছি সেটুকু ফেরত পেলেই হবে। এই ছবির মাধ্যমেই বাদল সরকারকে আমার শ্রদ্ধা।