নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: এ যেন আক্ষরিক অর্থেই ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’! এবারের ভোট নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে রাজ্যজুড়ে নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ করেছে নির্বাচন কমিশন। তার মধ্যেও আলাদা করে রাজ্যবাসীর নজর কেড়ে নিয়েছিল ডায়মন্ডহারবার লোকসভা কেন্দ্রের অধীন ফলতা বিধানসভায় কমিশনের তৎপরতা। সুদূর যোগীরাজ্য থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল তথাকথিত ‘সিংঘম’ এক পুলিশ অফিসারকে। ভোটের ঠিক আগের দিন ফলতার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীর নাম করেই কার্যত শাসানি দিতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করেছিল, আর যেখানে যা হোক না কেন, ফলতায় এবার ভোট নিয়ে কোনো অভিযোগের জায়গাই নেই! বাস্তবে কী দেখা গেল? বুথ ক্যাপচার, ইভিএমে টেপ ও আতর লাগিয়ে দেওয়া, ভোটারদের হুমকি—এরকম গুচ্ছ অভিযোগ এল সেই ফলতা থেকে। শুধু অভিযোগ উঠলই না, খোদ নির্বাচন কমিশন যাবতীয় অভিযোগকে মান্যতা দিয়ে গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ২১ মে পুনর্নির্বাচনের দিন ঘোষণা করল। যার একটাই অর্থ, ফলতার আম জনতার আরও একবার হয়রানি। কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ ফলতাবাসী। তাঁদের একটাই প্রশ্ন, এত ঢক্কানিনাদের পরও কেন নির্বিঘ্নে ভোট করাতে ব্যর্থ হল কমিশন?
কোন পরিস্থিতিতে কমিশনের এমন ‘তুঘলকি’ সিদ্ধান্ত? ভোটের দিন কয়েকটি বুথে ইভিএমে বিজেপি প্রার্থীর নামের পাশে টেপ লাগানোর অভিযোগ উঠতেই শুরু হয় বিতর্ক। পরবর্তী সময়ে ভোটারদের ভয় দেখানো, বুথ ক্যাপচারের মতো কিছু অভিযোগ সামনে আসে। একটি জায়গায় বাহিনীর বিরুদ্ধে মহিলাদের উপর লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে। ভোটগ্রহণ মিটতেই বিজেপি এই কেন্দ্রে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল। মাত্র ৩২টি বুথে অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছিল প্রাথমিকভাবে। পরে কমিশন মোট ৬৮টি বুথে অনিয়ম খুঁজে পায়। তাহলে কেন গোটা বিধানসভার ২৮৫টি বুথেই ফের ভোট নেওয়া হবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না অনেকে।
এই অবস্থায় গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্তে নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফলতার ভোটারদের। বিশেষত যাঁরা কর্মসূত্রে দূর শহরে বা ভিন রাজ্যে থাকেন, ২৯ এপ্রিল ভোট দিয়েই তাঁদের অনেকে কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছেন। তাঁদের সিংহভাগের পক্ষে আবার এসে ভোটদান সম্ভব নয়। এনিয়ে তাঁরা, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিস্তর দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছেন। অমর নস্কর নামে ফলতার এক শিক্ষক বলেন, ‘ভোটের দিন তো রাস্তা আধাসেনায় ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, সেটা স্পষ্ট। ফের আমাদের এক দিনের কাজকর্ম নষ্ট।’ তিনি আরও জানান, ভোট মিটে যাওয়ায় স্কুলগুলি চালু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। তুলসিরানি মণ্ডল নামে স্থানীয় এক মহিলার বক্তব্য, ‘কমিশন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন এসব করছে। যে ক’টি বুথে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল স্ক্রুটিনিতে, সেখানে আরেকবার ভোট নিলেই তো হত। পুরো বিধানসভায় নতুন করে ভোট নেওয়ার কি আদৌ কোনো দরকার ছিল?’ ফলতার বিভিন্ন গ্রামে মানুষ এখন এভাবেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের ‘খামখেয়ালি’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।