• ‘অ্যান্ড দ্য উইনার ইজ়...’ ৫৪ কেন্দ্রে শেষ হাসি কার?
    এই সময় | ০৪ মে ২০২৬
  • এই সময়: প্রকাশ্যে টেনশন ফ্রি দেখানোর চেষ্টা। কিন্তু স্বীকার না করলেও ভিতরে ভিতরে আশঙ্কা চোরাস্রোত বয়ে যাচ্ছে সবার মধ্যে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাড়ভাঙা খাটুনির পরে সবারই ভাগ স্ট্রং-রুমে বন্দি। এবার আবার স্ট্রং রুম নিয়েও বিস্তর নাটক চলছে। ফলে এটেনশনের পারদ আরও ঊর্ধ্বমুখী আর কয়েক ঘণ্টা পরই সব নাটকে পরিসমাপ্তি। গণনার আগের দিন উত্তরের সাত জেলার প্রার্থীরা কী ভাবে কাটালেন? কর্মীদের কী লাস মিনিট সাজেশন দিলেন দলীয় নেতৃত্ব

    প্রতিদিনের মতো পুরসভার নানা কাজে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি রবিবার দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে সভা করলেন শিলিগুড়ির তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেব। চোখে-মুখে চাপা টেনশন থাকলেও কথাবার্তায় তা বুঝতে দিলেন না গৌতম। বললেন, 'কাউন্টিং এজেন্টদের নিয়ে সভা ছিল। এটা প্রথম নয়, আগেও এই ধরনের কাজ বহুবার করেছি। তবে এ বার দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ কিছু নির্দেশ ছিল। সেই বিষয়গুলি সকলকে বুঝিয়ে বলার জন্যই মিটিং ডাকা হয়েছে।' দলের নির্দেশ মেনে সকাল থেকেই মন্দিরে পুজো দিতে ছুটলেন বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ। পুজো দিলেন রথখোলা কালীবাড়িতে। এরপর বিকেলে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে হাসমিচকে যান। তিনি বলেন, 'যে ভাবে মানুষ কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট দিয়েছেন আমরা সে জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।'

    ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির বিজেপি প্রার্থী শিখা চট্টোপাধ্যায় এ দিন শান্তিনগরের দলীয় অফিসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করলেন দিনের অধিকাংশ সময়ে। এর মধ্যেই পুজো দিতে পৌঁছলেন ইসকন মন্দিরে। এ ছাড়াও জ্যোতিনগর এলাকার এক জায়গায় পুজো ও যজ্ঞের আয়োজন করলেন শিখা। এরপর বিকেলেই তিনি রওনা দিলেন জলপাইগুড়ির উদ্দেশে। শিখা বলেন, 'আগামিকাল সকাল সাতটার আগে কাউন্টিং এজেন্ট এবং প্রার্থীকে কাউন্টিং হলে প্রবেশ করতে হবে। শিলিগুড়ি থেকে রওনা দিয়ে হলে পৌঁছনো মুশকিল। তাই আগের দিনই রওনা হতে হচ্ছে।' শিখা একাই নন, রবিবারই জলপাইগুড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন তৃণমূলের রঞ্জন শীলশর্মা এবং সিপিএমের দিলীপ সিং।

    আলিপুরদুয়ার বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী পরিতোষ দাস রবিবার দুপুর ১২টা থেকে যেতে শুরু করেন মন্দিরে। প্রথমে দুর্গাবাড়ি মন্দিরে গিয়ে মায়ের আশীর্বাদ নেন। পরে যান ছিন্নমস্তা মন্দির ও আদ্যামা মন্দিরে। তিনি বলেন, 'একটি বেসরকারি ভবনে এজেন্টদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছি। তাঁরা যাতে গণনায় ঠিক মতো কাজ করতে পারেন, তার জন্য আলোচনা হয়েছে।' সোমবার সকাল ছ'টার আগেই স্নান-পুজো সেরে গণনা কেন্দ্রে যাবেন বিজেপি প্রার্থী। জানালেন, কোনও টেনশন নেই। ওই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুমন কাঞ্জিলাল বলেন, 'কী ভাবে গণনা প্রক্রিয়া চলবে তা এজেন্টদের বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া দলনেত্রী আমাদের ভার্চুয়ালি যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেই মতো কাজ হবে। রাতে ঘুম হচ্ছে। দু'টো-আড়াইটার পরে যতটুকু হয় ততটুকুই। সোমবার মা এবং ঠাকুরকে প্রণাম করে গণনা কেন্দ্রে যাব।'

    ইংরেজবাজারের বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়ি পরিবার নিয়ে সময় কাটালেন। মানসিক ভাবে চাঙা থাকতে শরীরচর্চায় মনোযোগ দিলেন। তাঁর কথায়, 'এই কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে কোনও এগজ়িট পোল বিজেপিকে পিছনে রাখেনি। তাই অতটা টেনশন নেই।' এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী আশিস কুণ্ডু রবিবার বাড়িতেই পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে হাসিমজা করেই টেনশন মেটানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বলেন, 'যে কোনও প্রতিযোগিতায় জয় পরাজয় আছে। তবুও জয়ী হব, এটাই আশা করি। গণনার আগের দিন তো একটু হলেও টেনশন হবে।'

    মালদা এবং হবিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী গোপালচন্দ্র সাহা, জুয়েল মুর্মু তাঁদের নিজেদের এলাকার কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও দলীয় কর্মীদের সঙ্গেই সময় কাটালেন। তাঁরা বলেন, পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের আগে যেমন টেনশন হয়। ঠিক তেমনই মনে সেই টেনশন রয়েছে। অন্যদিকে মালদা ও গাজোল কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী লিপিকা বর্মন ঘোষ ও প্রসেনজিৎ দাস গণনার আগে টেনশনমুক্ত হতেই পরিবার নিয়ে বাইরে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সুজাপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন একটি মাজারে যান। রতুয়ার কংগ্রেস প্রার্থী মুত্তাকিন আলম ইংরেজবাজার শহরেই সহকর্মীদের সঙ্গে খোশমেজাজে আড্ডা দিলেন। ইংরেজবাজারের সিপিএম প্রার্থী অম্বর মিত্র সারাদিন কাটালেন পার্টি অফিসে।

    রায়গঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী এদিন স্ট্রং রুম পরিদর্শন করে কর্মীদের সঙ্গে সময় কাটান। সোমবার বন্দর রামসীতা মন্দিরে পুজো দিয়ে গণনা কেন্দ্রে যাবেন। তাঁর কথায়, 'কোনও ভয় নেই। সারা বছর পড়াশোনা করে পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষায় ভালো ফল করে পাশ করব।' রায়গঞ্জের বিজেপি প্রার্থী কৌশিক চৌধুরী বলেন, 'ভয় বা চিন্তা নেই। তবে সারা রাত কর্মীদের সঙ্গেই থাকব। তৃণমূল যাতে কোনও কারচুপি করতে বা আমাদের এজেন্টদের বাধা না দিতে পারে, তা নিয়ে সজাগ রয়েছি।' করণদিঘির সিপিএম প্রার্থী মহম্মদ সাহাবুদ্দিন পুরো দিনটা ঘুমিয়ে কাটান। রাতে কর্মীদের নিয়ে রায়গঞ্জে যাবেন। সেখানেই কর্মীদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে সকাল থেকে গণনাকেন্দ্রমুখো হবেন।

    ইটাহারের তৃণমূল প্রার্থী মোশারফ হোসেন, কালিয়াগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী উৎপল মহারাজদের দাবি, রেজাল্ট নিয়ে কোনও টেনশন নেই। চাকুলিয়ার কংগ্রেস প্রার্থী আলি ইমরান রামজ (ভিক্টর) আবার সকাল থেকে একাধিক বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন। তাঁর কথায়, 'আমার এলাকার জাতিধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ আমার জন্য প্রার্থনা করেছেন।' ইসলামপুরের তৃণমূল প্রার্থী কানাইয়ালাল আগরওয়ালকে নিজের আসন ছাড়াও জেলার ন'টি কেন্দ্রের খোঁজখবর রাখতে হচ্ছে। কারণ তিনি জেলা সভাপতি। ফলাফল নিয়ে তাঁরও তেমন কোনও চিন্তা নেই বলে দাবি করলেন।

    জলপাইগুড়ি সদর কেন্দ্রের যুযুধান দুই প্রার্থী তৃণমূলের কৃষ্ণ দাস ও বিজেপির অনন্ত দেব অধিকারী শেষ মুহূর্তে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান নিয়ে কাটাছেঁড়া করলেন। কর্মীদের সঙ্গে জরুরি আলোচনা সেরে নিয়েছেন তাঁরা। কারেন্ট অফ করে ইভিএমে কারচুপি হতে পারে, এই আশঙ্কা জানিয়ে দলের নির্দেশে গণনাকেন্দ্রের বাইরে ট্রান্সফর্মারের সামনে রাতভর কর্মীদের মোতায়েন রাখলেন কৃষ্ণ। রাজগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী দীনেশ সরকার রবিবার রাতেই এজেন্টদের নিয়ে জলপাইগুড়ি চলে আসছেন। মহিলা তৃণমূল কর্মীদের আবদারে নাগরাকাটার তৃণমূল প্রার্থী সঞ্জয় কুজুরকে দেখা গেল সবাইকে নিয়ে আইসক্রিম খেতে। আবার দিনভর বুথভিত্তিক যোগ-বিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেন মালবাজারের তৃণমূল প্রার্থী বুলু চিকবরাইক। বিজেপির মালবাজার বিধানসভার প্রার্থী শুক্রা মুন্ডা বিধানসভার বিভিন্ন মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেন।

    এই জেলায় অনেক প্রার্থীই টেনশনের বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন। তবে ব্যতিক্রমী বালুরঘাটের বিজেপি প্রার্থী বিদ্যুৎকুমার রায়। তিনি বলেন, 'ফল নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই। মানুষ পরিবর্তনের জন্য স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোট দিয়েছেন। আমার দারুণ ঘুম হচ্ছে।' এই কেন্দ্রের আরএসপি প্রার্থী অর্ণব চৌধুরী বলেন, 'ফলাফল নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়েছে। তবে মানুষের প্রতি ভরসা রয়েছে।' বিদ্যুতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা ঘোষ বলেন, 'ফলাফল নিয়ে অল্প হলেও চিন্তা রয়েছে। তবে আমরা আশাবাদী জয়ের ব্যাপারে।' হরিরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী, বিদায়ী মন্ত্রী বিপ্লব মিত্র বলেন, 'পরীক্ষা দিয়েছি কিছুটা তো চিন্তা থাকবেই। তবে আমরা ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী।'

    দিনহাটা বিধানসভার প্রার্থী তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ রবিবার সকাল থেকেই বাড়িতেই সময় কাটিয়েছেন। টেনশনমুক্ত দেখিয়েছে তাঁকে। বিকেলের পর দলীয় নেতৃত্ব এবং কর্মীদের সঙ্গে গণনা নিয়ে আলোচনা সারেন। ফল নিয়ে কোনও আলাদা চাপ নেই বলে দাবি করেন তিনি। মাথাভাঙা বিধানসভার বিজেপির প্রার্থী প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক সকাল থেকেই একাধিক বৈঠক সেরেছেন। বিকেলের পর থেকে শহরের বিভিন্ন মন্দিরে তিনি পুজো দেন। বিজেপির তুফানগঞ্জ বিধানসভার প্রার্থী মালতি রাভা বলেন, 'একটু তো টেনশন হচ্ছেই। কাউন্টিং এজেন্ট এবং নেতৃত্বের সঙ্গে সারাদিনই আলোচনা ব্যস্ত ছিলাম।' তৃণমূলের কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী পার্থপ্রতিম রায় বলেন, 'একটু চাপা টেনশন হচ্ছে। তবে এর আগে বিধানসভা এবং লোকসভার গণনার অভিজ্ঞতা আছে। তাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি।'

    মন্দির, দরগায় সময় কাটালেন মেখলিগঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী পরেশচন্দ্র অধিকারী। রবিবার সাতসকালে তিনি পৌঁছে যান মেখলিগঞ্জের রামকৃষ্ণ আশ্রমে। এরপর সেখান থেকে সোজা চ্যাংড়াবান্ধা হনুমান মন্দিরে যান। সেখানে পুজো দিয়ে লাড্ডু বিলি করেন উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে। সেখান থেকে হলদিবাড়ির হুজুর সাহেবের মাজারে চাদর চড়িয়ে প্রার্থনা করেন।

    তথ্য ও ছবি: দিব্যেন্দু সিনহা, নীলাঞ্জন দাস, রূপক সরকার, চাঁদকুমার বড়াল, সব্যসাচী ঘোষ, মিঠুন ভট্টাচার্য, কৌশিক দে, বাসুদেব ভট্টাচার্য, সুজিত রায়, অর্ঘ্য বিশ্বাস, সুমিত ঘোষ

  • Link to this news (এই সময়)