• একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রেরও লাইসেন্স নেই! কাউন্টিংয়ের পরেই 'অ্যাকশন'
    এই সময় | ০৪ মে ২০২৬
  • রূপক সরকার, বালুরঘাট

    এক যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং কেন্দ্রের নেশামুক্তি বিরুদ্ধে তাঁকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ ওঠার ঘটনায় গা ঢাকা দিলেন ওই সেন্টারের কর্ণধার বিশ্বজিৎ দাস। তাঁর ফোন সুইচড অফ। এ দিকে ঘটনার দু'দিন পরেও মৃতের পরিবারের তরফে নেশামুক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

    স্থানীয় সূত্রে খবর, ওই বেসরকারি নেশামুক্তি কেন্দ্রটি বালুরঘাট শহরের আনন্দবাগান এলাকায় একটি ভাড়াবাড়িতে চলত। মাস দুয়েক আগে সেটি ২২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ক্লাবের ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। ওই সেন্টারে প্রায় ৩০ জন আবাসিক ছিলেন। শুক্রবারের ঘটনার পরে সবাই পালিয়ে যান। ওই দিনই সেন্টারে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ। জানা গিয়েছে, আবাসিকদের মধ্যে বেশিরভাগই বালুরঘাটের বাসিন্দা। প্রায় প্রত্যেকে তরুণ এবং কিশোর। তাঁরা সকলেই নিজের নিজের বাড়ি ফিরে গিয়েছেন।

    ইসরাফুল হক (২৬) নামে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার এক যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার পরে জানা যায়, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ওই নেশামুক্তি কেন্দ্রটি চলছিল। এ বার প্রশ্ন উঠেছে, বালুরঘাট তথা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আর কতগুলি নেশামুক্তি কেন্দ্র চলছে? প্রশাসন এ ব্যাপারে তৎপর হতেই ঝুলি থেকে বেড়াল বেরোতে শুরু করেছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ২৫-৩০টি নেশামুক্তি কেন্দ্র রয়েছে, যাদের লাইসেন্স নেই। একটি নেশামুক্তি কেন্দ্র খুলতে প্রথমে, রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের থেকে লাইসেন্সের অনুমতি নিতে হয়। এরপরে রাজ্যের মেন্টাল হেলথ বিভাগে নির্দিষ্ট ফর্ম ফিলআপ করে আবেদন জানাতে হয়। দপ্তরের আধিকারিক-কর্মীরা সেই জায়গা পরিদর্শন করেন।

    সব ঠিকঠাক থাকলে তাঁরা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরকে এনওসি দেন। তার পরেই মেলে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের অনুমোদন। এ ছাড়াও আরও কয়েকটি অনুমতির প্রয়োজন। কিন্তু জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সাফ জানিয়েছে, ওই ২৫-৩০টি সেন্টারকে তাদের তরফে কোনওরকম অনুমোদন দেওয়া হয়নি। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক সুদীপ দাস বলেন, 'জেলায় কোনও সরকারি নেশামুক্তি কেন্দ্র নেই। কাউকে অনুমতিও দেওয়া হয়নি। বিগত দিনে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি নেশামুক্তি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে ওই কেন্দ্রগুলির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

    শুধু ইসরাফুলের ঘটনা নয়, এর আগে বহু আবাসিকের মৃত্যুতে নেশামুক্তি কেন্দ্রের দিকে আঙুল উঠেছে। ২০২২-এর অক্টোবরে বালুরঘাটের পরানপুরে একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রে এক জনকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বালুরঘাট থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের হয়। তার পরে সেই সেন্টারটি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে গঙ্গারামপুরে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পিছনে নেশামুক্তি কেন্দ্রের হাত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও পরে এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না-হওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যায়।

    ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে গঙ্গারামপুরের একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রে ভর্তি থাকাকালীন এক ব্যক্তিকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ ওঠে। ওই বছরই নভেম্বরে তপনের লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রে এক ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় পরবর্তীতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। গত বছর এপ্রিলে পতিরামের একটি নেশামুক্তি কেন্দ্রে এক জনকে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ধামাচাপা পড়ে যায়।

    এ ছাড়াও নেশা ছাড়ানোর নামে রোগীদের মারধর করা, কম খাবার দেওয়া- এমনকী, খেতে না-দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে হামেশাই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নেশামুক্তি কেন্দ্রে যাঁরা এক সময়ে ছিলেন, তাঁরাই পরবর্তীতে নতুন করে নেশামুক্তি কেন্দ্র খোলেন। সেন্টার খোলার ক্ষেত্রে মানা হয় না সরকারি নিয়ম। ঘটনাগুলিতে পুলিশ কড়া ব্যবস্থা না-নেওয়ায় অবৈধ নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলি আরও পার পেয়ে গিয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে এ বার পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বস্থ করেছেন এসপি চিন্ময় মিত্তাল। তিনি বলেন, 'ভোট-গণনা মিটলেই অবৈধ নেশামুক্তি কেন্দ্রগুলির বিরদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

  • Link to this news (এই সময়)