• কাটোয়ার বাগটোনা গ্রামে ৪০টি পরিবার বাঁচিয়ে রেখেছেন তালপাতার হাতপাখা তৈরির শিল্পকে
    বর্তমান | ০৪ মে ২০২৬
  • সংবাদদাতা, কাটোয়া: প্রযুক্তির যুগে বাঁচার লড়াইয়ে তালপাতার পাখা শিল্প। ভোটের তাপ আসেনা শিল্পীদের ঘরে। কাটোয়ার শ্রীখণ্ডের বাগটোনা গ্রামে তালপাতার হাতপাখা তৈরির শিল্প এখনও টিকিয়ে রেখেছেন শিল্পীরা। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে লুপ্তপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মহিলারা। তাঁরা সংসারের স্বপ্ন বোনেন তালপাতায়।

    কাটোয়ার-১ ব্লকের শ্রীখণ্ড পঞ্চায়েতের বাগটোনা গ্রামের থাণ্ডার পাড়ার ৪০টি পরিবারে প্রায় দু’শ জন বাসিন্দা বহুবছর ধরে বংশ পরম্পরায় তালপাতার পাখা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে। গ্রীষ্মকালে এখনও বাংলার গ্রামে তালপাতার পাখার চাহিদা রয়েছে। শুধু তাই নয়, এখনও রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে পুরানো দিনের তালপাতার টকুই, ঝুড়ি প্রভৃতি সামগ্রীর চাহিদা বিপুল। কাটোয়ার বাগটোনা গ্রামের প্রচুর মানুষ তালপাতার পাখা, টকুরি তৈরি করেই সংসার চালান। ফাল্গুন-চৈত্র মাস আসতেই বাগটোনা গ্রামে ঘরে ঘরে তালপাতার পাখা বুনতেই ব্যস্ত থাকেন বাড়ির পুরুষ থেকে মহিলারাও। সংসার সামলে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও বসে বসে পাখা, টকুই বুনে সংসার চালান। চৈত্র মাস থেকে শ্রাবন মাস পর্যন্ত কাটোয়া, কেতুগ্রাম, মঙ্গলকোট, ভাতার, বলগোনা, বর্ধমান, বীরভূম প্রভৃতি এলাকার বাজারগুলিতে পাখা বিক্রি করেন এই গ্রামের শিল্পীরা। এবার তীব্র গরমে তালপাতার চাহিদাও বাড়ছে। ভালো বিক্রিতে শিল্পীদের মুখে হাসি ফুটেছে। প্রযুক্তির যুগেও তালাপাতার চাহিদা বাড়ছে। এটাতেই বেঁচে রয়েছেন শিল্পীদের পরিবার। একটা সময় তো তালপাতার পাখা উঠেই গিয়েছিল এসি এর দাপটে। তবে আবার বাজার চাঙা হচ্ছে। আর শিল্পের সঙ্গে গ্রামের সুনাম জড়িয়ে রয়েছে। গ্রাম জুড়ে এমন শিল্পই দিশা দেখাচ্ছেন খেটে খাওয়া পরিবারগুলিকে।

    বাগটোনা গ্রামের বাসিন্দা রেখা থাণ্ডার, ধুলি থাণ্ডার, চম্পা থান্ডার বলেন, ভোট এলেও তো আমাদের ভাগ্য বদলায় না। আমাদের এই শিল্পের প্রতিই নজর দিতে হ।৷ তাই কে জিতল বা কে হারল তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সারাবছর আমরা অল্প অল্প করে পাখা বুনে বাড়িতেই মজুত রাখি। বৈশাখ মাস আসতেই বাজারে বিক্রি করি। গরমে তালপাতার পাখার চাহিদা বাড়ছে। এবার বাজারে জোগান দিতে পারছি না। তবে আমরা ঠিকমতো পারিশ্রমিক পাই না। তালপাতা গাছ থেকে পেড়ে দেওয়া ও তালপাতার দাম নিয়ে একটা তালগাছ পিছু ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আর একটা পাখা বিক্রি করে মাত্র ৮-১০ টাকা পাওয়া যায়। এতে কি সংসার চলে? বাগটোনা, শ্রীখণ্ড প্রভৃতি বিভিন্ন গ্রামের সার দিয়ে রয়েছে প্রচুর তালগাছ। এইসব তালগাছ থেকে পাতা পেড়ে নিয়ে এসে রোদে শুকানো হয়। তারপর সেগুলি বুনে বাহারি রঙ দিয়ে হাতে ঘোরানো তালপাতা তৈরি হয়। তাছাড়া গ্রামে গৃহস্থের ব্যবহার করা টকুই, ঝুড়ি প্রভৃতি তৈরি হয়। তারপর সেগুলি বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন বৈদ্যুতিক পাখা, ঘরে ঘরে এসি মেশিনের চাহিদা বাড়লেও গ্রামাঞ্চলে এখনও তালপাতার পাখার চাহিদা রয়েছে। শিল্পী জয়ন্তী থাণ্ডার, লাল্টু থাণ্ডার বলেন, একটা গাছ থেকে প্রায় ৫০টি পাখা তৈরি করা যায়। সারাদিনে ৪০ থেকে ৪৫ টা পাখা তৈরি করে দু’শ থেকে তিনশ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। বাজারে পাইকারি একটা পাখা ৭ থেকে ৯ টাকা আর খুচরো ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করা হয়। তাছাড়া জামাইষষ্ঠীতে তালপাতার পাখা, টকুই প্রভৃতি দিয়ে মা ষষ্ঠীর পুজোর জন্য চাহিদা বেশি থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পাড়ি দেয় আমাদের তৈরি হাতপাখা।
  • Link to this news (বর্তমান)