মেরুকরণ, পরিবর্তনের হাওয়া নাকি SIR, কোন ম্যাজিকে বাংলায় ফুটল পদ্ম?
প্রতিদিন | ০৪ মে ২০২৬
বাংলায় ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান। পরিবর্তনের ঢেউয়ে প্রথমবার রাজ্যে ফুটল পদ্ম। বাংলার রাজনীতির অতীত ট্রেন্ড বলে, পরিবর্তনের নির্বাচনে শাসক শিবির ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। এবারেও বিশেষ ব্যতিক্রম হল না। খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রায় দু’শোর কাছাকাছি আসন নিয়ে বাংলার মসনদে বসতে চলেছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু কোন ম্যাজিকে? বাংলায় এই গেরুয়া ঝড়ের কারণ কী?
ধর্মীয় মেরুকরণ: বঙ্গে বিজেপির বিরাট জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ। শুভেন্দু অধিকারীর লাগাতার হিন্দুত্বের প্রচার, অমিত শাহর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি, সর্বোপরি বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মধ্যে ‘অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা’দের ভয় ধরানো। বিজেপির এই প্রচার কৌশল বাংলায় একপ্রকার অকল্পনীয় কাজটি করে দেখিয়েছে। বাংলা হিন্দু ভোট এবং মুসলমান ভোটে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। ভোটের ফল বলছে, অনেক কেন্দ্রে মুসলিম ভোট কিছুটা বিভক্ত হয়েছে, কিন্তু সে তুলনায় হিন্দু ভোটাররা অনেক বেশি একজোট হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। অন্তত প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তেমনটাই মনে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা: বিজেপির জয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে অবশ্যই বলতে হয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা। রাজ্যে ১৫ বছর ধরে সরকার চালানোর দরুণ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছিল। রাজ্যে কর্মসংস্থানের সমস্যা। বড় শিল্পের অভাব, নিয়োগ দুর্নীতি, রাস্তাঘাটের অবনতি এসব শাসক শিবিরের বিরুদ্ধে গিয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার দরুণ স্থানীয় স্তরের তৃণমূল নেতাদের মধ্যে দাদাগিরির মনোভাব তৈরি হয়েছিল। বাড়ছিল তোলাবাজি, কাটমানি, সিন্ডিকেট রাজের অভিযোগ। সেসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমা হচ্ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিজেপি সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে নিজেদের উপযুক্ত বিকল্প হিসাবে তুলে ধরেছে।
আগের ভুল থেকে শিক্ষা: ২০২১ সালের প্রচারে যে ভুলগুলি বিজেপি করেছিল, সেগুলির একটিও এবার করেনি। আগের বার প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, ‘দিদি ও দিদি’ স্লোগান, ভিনরাজ্যের নেতাদের দাপাদাপি, এসব বাঙালি ভালোভাবে নেয়নি। বস্তুত ২০২১ পর্যন্ত বিজেপির সভা সমিতিতে মূলত ভিনরাজ্যের নেতাদেরই দাপাদাপি দেখা যেত। কৈলাস বিজয়বর্গীয়র মতো ভিনরাজ্যের নেতারা প্রায় নিত্যদিন সংবাদমাধ্যমে মুখ দেখিয়ে বেড়াতেন। তাছাড়া দলের অন্দরে গোষ্ঠীকোন্দল, কামিনিকাঞ্চনের অভিযোগ রীতিমতো জর্জরিত করে রেখেছিল গেরুয়া শিবিরকে। এবার ভোটের অনেক আগে থেকে খোদ অমিত শাহ সেসব নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রচারে কেন্দ্রীয়ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ না করে তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যর্থতা তুলে আনা বা স্থানীয় স্তরের ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার মতো কৌশল বিজেপির কাজে লেগেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেভাবে চিরাচারিত ‘বিরোধিতা’র রাজনীতি করার সুযোগই পাননি। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে শত্রু হিসাবে বেছেছেন নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু সেই কৌশল কাজে দেয়নি।
বিজেপির বাঙালিয়ানা: ২০২১ থেকে ২০২৬- এই পাঁচবছর ধরে গেরুয়া শিবির ধীরে ধীরে বহিরাগত তকমা ঝেড়ে ফেলার মরিয়া চেষ্টা করে গিয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই শমীক ভট্টাচার্যের মতো বাঙালি ‘ভদ্রলোক’কে রাজ্য সভাপতি করা। জয় শ্রীরামের আগে জয় মা কালী স্লোগান তুলে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে ঝালমুড়ি খেয়েছেন, গঙ্গায় হাওয়া খেয়েছেন। বিজেপি প্রার্থীরা মাছ হাতে প্রচারে বেরিয়েছেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও রাজ্যে এসে মাঝভাত খেয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই, বহিরাগত তকমা ঝেড়ে বাঙালি ভদ্রলোকদের মধ্যে নিজেদের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরা। সেটা তারা সফলভাবে করতে পেরেছে। গেরুয়া শিবির এতদিন তৃণমূলের ভাতার রাজনীতি নিয়ে কটাক্ষ করত। কিন্তু এবারে ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অন্তত বিজেপি তৃণমূলকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। সেটারও প্রভাব পড়েছে ভোটব্যাঙ্কে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: বিজেপি স্বীকার করুক না করুক, গেরুয়া শিবিরের এই জয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। SIR-এর জেরে যে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বাতিল হল, যেভাবে ভোটের ঠিক আগে আগে তৃণমূলের ভোট মেশিনারি কার্যত বিধ্বস্ত করে দেওয়া হল, সেগুলি আখেরে সুবিধা দিয়েছে বিজেপিকে। অন্তত তৃণমূলের তেমনই অভিযোগ। রাজ্যের শাসকদল বলছে, সেই দু’দফা নির্বাচন থেকে শুরু করে ভোটগণনা পর্যন্ত, সর্বস্তরে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিজেপি অবশ্য কমিশনের নিরপেক্ষতাকে ধন্য ধন্য করছে।
তাছাড়া এসবের বাইরে যে ফ্যাক্টরকে উপেক্ষা করা যায় না, সেটা হল পরিবর্তনের হাওয়া। গোটা রাজ্যে পরিবর্তনের চোরাস্রোত তৈরি হয়েছিল। তথাকথিত ফ্লোটিং ভোটার, তৃণমূলের দাপটে অতিষ্ঠ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা সেই চোরাস্রতে গা ভাসিয়েছেন। যার অবধারিত ফল বঙ্গে গেরুয়া শিবিরের এই জয়।