• অ্যাকশন হিরো থেকে ক্ষমতার মসনদে, টিকে থাকতে পারবেন তো বিজয়?
    এই সময় | ০৪ মে ২০২৬
  • তামিল সিনেমার পর্দায় তিনি ছিলেন ‘মাস হিরো’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক নায়ক। বাস্তব রাজনীতির ময়দানেও সেই ছবি মিলে গেল। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে বিজয়ের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে। এই জয় শুধু যে একটি নির্বাচনী সাফল্য, তা নয়। বরং তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ — বিজয়ের এই উত্থান সহজ ছিল না। জনপ্রিয় তিনি ছিলেন। তবে সেটাই তাঁর এই রাজনৈতিক সাফল্যের একমাত্র কারণ নয়। কৌশলী ভাবনা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তে বিজয়ী হলেন বিজয়।

    নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। সবাই চেনে ‘থালাপতি’ নামে। পরিচালক বাবা এস. এ. চন্দ্রশেখরের হাত ধরেই তাঁর প্রথম ক্যামেরার সামনে আসা। শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু। ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি বাড়ে আগ্রহ। একটা সময় নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ধীরে ধীরে তামিল সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। তিন দশকেরও বেশি দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি অসংখ্য হিট ছবিতে অভিনয় করেছেন। দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির অভিনেতা হিসাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।

    বিজয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। সিনেমায় তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষের হয়ে লড়াই করে। এই ইমেজই তাঁকে দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই জনপ্রিয়তা শুধু বিনোদনের জগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিসরেও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে।

    ২০২৪ সালে তিনি নিজের রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম’ (TVK) গঠন করেন। শুরু থেকেই তিনি আলাদা পথ বেছে নেন। কোনও বড় দলের সঙ্গে জোট না করে. সরাসরি জনতার সামনে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন। এই দল গঠনের পর দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে মন দেন। লোকসভা নির্বাচন এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন।

    প্রথমবারেই চমক

    ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার লড়াই করেই চমক দেখাল বিজয়ের দল। বহু আসনে এগিয়ে থেকে রাজ্যের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসছে বিজয়ের দল 'টিভিকে'। তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, সেটা স্পষ্ট।

    তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মূলত দুই প্রধান আঞ্চলিক দলের হাতেই ঘুরেছে— 'ডিএমকে' এবং 'এআইএডিএমকে'। এই দুই দলের মধ্যেই পালাবদল হয়ে সরকার গঠনের ধারা বহু বছর ধরে চলেছে। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসর কার্যত এই দুই শক্তিকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের 'এন্ট্রি'তে সেই সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে।

    বিজয়ের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো বিজয়ের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। দুর্নীতি, বিতর্ক থেকে নিজেকে দূরে রাখা। যুবসমাজের বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন বিজয়। তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করেছেন তিনি। অনুরাগীদের ভালোবাসা ভোট ব্যাঙ্কে আছড়ে পড়েছে। এ ছাড়াও বিজয়ের জনসংযোগ অবাক করার মতো।

    মুখ্যমন্ত্রীর পথে

    তামিলনাড়ুর ক্ষমতার মসনদে বসতে চলেছেন বিজয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়েই এই ধরনের সাফল্য অত্যন্ত প্রশংসারযোগ্য এবং বিরলও বটে। দলের নেতৃত্বের প্রতি মানুষের যে আস্থা আছে, তারই প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে তামিলনাড়ুর এই ফলাফল।

    স্টারডমকে কাজে লাগিয়ে তারকা প্রার্থীরা নির্বাচনে জয় লাভ করেন। এই ধারণা খুবই পরিচিত। তবে বিজয়ের রাজনৈতিক সফর সেই ধারণাকে খানিকটা হলেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। হিরো বিজয়ের জনপ্রিয়তা যে আছে, সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। তবে অনেকেই মনে করছেন তাঁর পরিকল্পনা, সাংগঠনিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক কৌশল, জনসংযোগের স্ট্র্যাটেজি বিজয়কে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে গেল।

    তবে এই সাফল্যই শেষ কথা নয়। বরং এখান থেকেই শুরু আসল পরীক্ষার। বিজয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই জনসমর্থন ধরে রাখা এ দীর্ঘ রাজনৈতিক পরম্পরা বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি এই জায়গায় পৌঁছেছেন। প্রশাসন চালানো, দলকে একসূত্রে বাঁধা রাখা, এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তাঁর এই উত্থান যতটা আলোচনার, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হবে তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে, এই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী কিনা।

  • Link to this news (এই সময়)