ভেঙে পড়ল ‘শেষ দুর্গ’ও! লোকসভার পরে এ বার বহরমপুর বিধানসভাতেও পরাস্ত অধীর, ফের জয়ী বিজেপির সুব্রত
আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
কংগ্রেসকে তৃতীয় থেকে প্রথম করার লড়াইয়ে দ্বিতীয় বার নেমেছিলেন তিনি। ফল বলছে, সেই লড়াইয়ে ব্যর্থ অধীর চৌধুরী। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে পরাস্ত হলেন তিনি। সেখানে জিতেছেন বিজেপির সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্র। দু’বছর আগে লোকসভা ভোটে অন্য ছ’টি বিধানসভা আসনে পিছিয়ে থাকলেও এক মাত্র বহরমপুর বিধানসভায় ‘লিড’ ছিল অধীরের। এ বার তাঁর সেই দুর্গও ভেঙে পড়ল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বহরমপুরে কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী তৃতীয় হয়েছিলেন। এ বার অধীরের স্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়।
১৯৯৯ সালে বহরমপুর লোকসভা আসনে অসম্ভবকে ‘সম্ভব’ করেছিলেন অধীর। মাত্র এক বছরের মধ্যে কংগ্রেসকে তৃতীয় থেকে টেনে প্রথম স্থানে তুলেছিলেন। মুর্শিদাবাদ জেলার ওই লোকসভা আসনে ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছিলেন আরএসপি প্রার্থী প্রমথেশ মুখোপাধ্যায়। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সব্যসাচী বাগচী পেয়েছিলেন ৩০ শতাংশের বেশি ভোট। আর তৃতীয় স্থানে থাকা কংগ্রেস প্রার্থীর ঝুলিতে গিয়েছিল সাকুল্যে ২২ শতাংশেরও কম ভোট। অঙ্কের হিসাবে আরএসপি প্রায় ৩ লক্ষ ৮৬ হাজার, বিজেপি প্রায় ২ লক্ষ ৬২ হাজার এবং কংগ্রেস প্রায় ১ লক্ষ ৮৯ হাজার ভোট পেয়েছিল।
কিন্তু বছর ঘুরতেই বহরমপুর বদলে গিয়েছিল চমকপ্রদ ভাবে! প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন অধীর। প্রমথেশের ঝুলিতে গিয়েছিল সাড়ে ৩৬ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট। বিজেপির সব্যসাচী মাত্র সাড়ে ১৪ শতাংশ। ২৮ বছর আগেকার সেই লোকসভা নির্বাচনে নবগ্রামের তৎকালীন বিধায়ক অধীর পেয়েছিলেন ৪ লক্ষ ৩৪ হাজারেরও বেশি ভোট। আরএসপি এবং বিজেপি যথাক্রমে ৩ লক্ষ ৩৮ হাজার এবং ১ লক্ষ ৩৪ হাজার।
বহরমপুর লোকসভা থেকে টানা পাঁচ বার জেতার পরে ২০২৪-এ মুখ থুবড়ে পড়েছিল অধীরের বিজয়রথ। তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে ৮৫ হাজারেরও বেশি ভোটে হারতে হয়েছিল তাঁকে। তার আগে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের জমানায় কেন্দ্রে রেল প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের সময় লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতার দায়িত্বও পালন করেছেন। হয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতিও।
হারের অভিজ্ঞতা অবশ্য অধীরের হয়েছিল জীবনের প্রথম নির্বাচনেই। বাম জমানায় ১৯৯১ সালে তিনি মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম আসনে সিপিএমের শিশির সরকারের কাছে প্রায় দেড় হাজার ভোটে পরাস্ত হয়েছিলেন। পাঁচ বছর পরে ওই নবগ্রামেই সিপিএম প্রার্থী মুজফ্ফর হোসেনকে ২০ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে প্রথম বার বিধানসভায় এসেছিলেন অধীর। ফৌজদারি মামলার জেরে এলাকাছাড়া কংগ্রেস প্রার্থী অধীরের সে সময়ে প্রচারের অনেকটাই হয়েছিল তাঁর বক্তৃতার ক্যাসেট বাজিয়ে! তার পরে ১৯৯৯ সালে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতে সাংসদ হয়ে যাওয়ায় বিধায়কপদ থেকে তিনি ইস্তফা দিয়েছিলেন। উপনির্বাচনে সে যাত্রায় নবগ্রাম থেকে জিতে বিধায়ক হন সিপিএমের এক সময়ের মুর্শিদাবাদ জেলা সম্পাদক নৃপেন চৌধুরী।
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বহরমপুর আসনে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্র। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তৃণমূলের নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়। ২০০৬, ২০১১ এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে জয়ী অধীর অনুগামী কংগ্রেস প্রার্থী তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মনোজ চক্রবর্তী ছিলেন তৃতীয় স্থানে। সুব্রত ৮৯ হাজার, নাড়ুগোপাল ৬২ হাজার এবং মনোজ ৪০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু লোকসভা ভোটে কংগ্রেস প্রার্থী অধীর বহরমপুর লোকসভায় পরাস্ত হলেও বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ‘লিড’ পান। বহরমপুর বিধানসভায় কংগ্রেস প্রার্থী অধীর ৮৩ হাজার, তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ ৪৬ হাজার এবং বিজেপি প্রার্থী নির্মল সাহা প্রায় ৪৭ হাজার ভোট পেয়েছিলেন।
তিন দশক পরে আবার ভোটে লড়তে নেমে এ বার অধীরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিজেপির বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত এবং বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তৃণমূলের নাড়ুগোপালের বিরুদ্ধে। একদা রাজনৈতিক সহযোগী নাড়ুগোপাল প্রতিটি প্রচারসভায় নিয়ম করে ব্যক্তি আক্রমণ করেছেন অধীরকে। সদর্পে ঘোষণা করেছেন, নবাবি জমানার মতোই ‘রবিনহুড’-এর মিথও ভেসে গিয়েছে ভাগীরথীর জলে। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা বহরমপুরের অলিগলিতে ধারাবাহিক ভাবে অধীরের প্রচারে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে শুনতে হয়েছে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। এমনকি, ভোটপর্ব শেষের পরেও শহরের কুঞ্জপুর-সাইদাবাদ এলাকায় বাড়িতে ঢুকে এক বৃদ্ধ-সহ তিন কংগ্রেস সমর্থককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে।
রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বলছে, ২০১৬ সালের পর থেকে কংগ্রেসের গড় মুর্শিদাবাদে তৃণমূল থাবা বসাতে শুরু করেছিল। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনেও তাঁরা জেলা পরিষদ-সহ অধিকাংশ ত্রিস্তর পঞ্চায়েত দখল করেছিল। পরের বছরের লোকসভা নির্বাচনে জেলার দু’টি লোকসভা আসনে জয়ী হওয়ার পাশাপাশি বহরমপুর কেন্দ্রে অধীরকে জোর ধাক্কা দিতে পেরেছিল। যেখানে বরাবরই অধীর দু’-তিন লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হতেন সেখানে ২০২৯ সালের নির্বাচনে ৮০ হাজারের সামান্য বেশি ভোটে জিতেছিলেন। এর পরে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্য থেকে বাম-কংগ্রেস কার্যত শূন্য হয়ে যায়। বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভার মধ্যে বহরমপুর বিধানসভায় জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির সুব্রত। বাকি ছ’টি বিধানসভায় জয়ী হন তৃণমূল প্রার্থীরা। তেমনই বিজেপিরও ভোটবৃদ্ধি হয়। যার জেরে বহরমপুর কেন্দ্রে ভোটের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। যা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে। যদিও ২০১৯ সালের ভোটের দিন বহরমপুরে তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে অধীর সরাসরি সংঘাতে জড়ালেও ২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন মোটের উপর শান্তিপূর্ণই ছিল। বস্তুত, প্রচারপর্বে কয়েক বার কংগ্রেস এবং তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত ঘটলেও ভোটে বাজিমাত করা কাঞ্চন কোনও বিতর্কেই জড়াননি।