• জেল খেটে আসা বালুকে তাঁর কেন্দ্রেই প্রার্থী করেছিলেন মমতা! তিন বারের বিধায়ককে এ বার প্রত্যাখ্যান হাবড়ার
    আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
  • ভোটগণনা শুরু থেকে হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি এগিয়ে ছিলেন। তাঁর নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী, বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মণ্ডলের থেকে ব্যবধান বৃদ্ধি করছিলেন। কিন্তু প্রথম কয়েক রাউন্ড পর হাবড়ায় উলটপুরাণ। তৃণমূল প্রার্থী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু) পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত হাবড়া-হারা হলেন তিনি। ২০১১ সালে ‘পরিবর্তনের’ ঢেউয়ে প্রথম বার হাবড়া জিতেছিলেন। ১৫ বছর পর আবার এক ‘পরিবর্তনের’ ঢেউয়ে হাবড়ায় তরী ডুবল বালুর! হারলেন ২৩ হাজার ৮০০ ভোটে।

    তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে বালু দলের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ২০০১ সাল থেকে টানা বিধায়ক। আসন বদলেছে, মন্ত্রিত্বের দফতরও বদলেছে। নাম জড়িয়েছে দুর্নীতিতে। জেল খেটেছেন। মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। জেল থেকে বেরোনোর পর অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি অবিচল ছিলেন। দুর্নীতির দায়ে জেল খাটলেও তিনি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন, তা বার বার প্রকাশ পেয়েছিল। তবে তার পরেও অনেকে ভেবেছিলেন এ বার আর টিকিট পাবেন না তিনি। তবে তাঁকে হাবড়ায় টিকিট দিয়েছিল তৃণমূল। যদিও বালুর পছন্দ ছিল তুলনায় ‘সহজ’ বারাসত।

    বালুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেসে। কিন্তু কংগ্রেস ভেঙে মমতা যখন নতুন দল গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেন, তখন থেকেই বালু তাঁর সঙ্গে। জননেতা হয়ে ওঠার স্বপ্ন ছিল। চেয়েছিলেন ভোটে জিতে বিধায়ক হতে। হয়েছিলেনও তা-ই।

    ২০০১ সালে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা থেকে লড়ে প্রথম বিধায়ক হন বালু। ২০০৬ সালে ওই আসনে আবার জেতেন। তবে ২০১১ সালে আসন বদল হয় তাঁর। গাইঘাটা তফসিলি সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ায় হাবড়া থেকে লড়েন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বালুকে খাদ্য ও খাদ্য সরবরাহ দফতরের দায়িত্ব দেন মমতা। ২০০১ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনার তৃণমূলের সংগঠনের রাশ হাতে রেখেছিলেন বালু। ছন্দপতন হয় জেলযাত্রার পর।

    ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১— পর পর তিন বার হাবড়া থেকেই জিতেছেন বালু। ২০১১ সালে ওই কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী প্রণব ভট্টাচার্যকে ২৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়িয়েছিলেন। সে বছর বিধানসভা ভোটে সিপিএম প্রার্থী আশিস মুখোপাধ্যায়কে ৪৫ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন বালু। তবে ২০২১ সালে হাবড়ার বিজেপি ‘ঝড়ে’ কিছুটা বেকায়দায় পড়তে হয় তাঁকে। জিতলেও বালুর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বিজেপি প্রার্থী বিশ্বজিৎ সিংহ। বালু জিতেছিলেন ৩, ৮৪১ ভোটে। এ বার হাবড়া থেকে বিজেপির টিকিটে লড়ছেন দেবদাস মণ্ডল। সিপিএম টিকিট দিয়েছে রিজিনন্দন বিশ্বাসকে আর কংগ্রেসের হয়ে লড়ছেন প্রণব ভট্টাচার্য।

    টানা ১০ বছর খাদ্য দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন বালু। সেই সময়কালের মধ্যে বরুণ বিশ্বাসের খুনের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল নিহতের পরিবার। ‘চালচোর’ বলেও কটাক্ষ করতেন বিরোধীরা। বালুর উত্তরোত্তর সম্পত্তিবৃদ্ধিও চোখে লেগেছিল অনেকের। ২০২১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে তাঁকে খাদ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে বন দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

    ২০২১ সালের পর তাঁর দফতর বদলালেও খাদ্য দফতরের দুর্নীতি মামলাতেই জেলে যেতে হয়েছিল বালুকে। রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইডির হাতে গ্রেফতার হন জ্যোতিপ্রিয়। ১৪ মাস জেলে থাকার পর ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি জামিন পান। তবে জেলে থাকলেও তৃণমূলে তাঁর ‘গুরুত্ব’ কমেনি। বার বার আলোচনায় উঠে এসেছেন। শিক্ষা দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছিল তৃণমূল। জেলযাত্রার এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করে তৃণমূল। কিন্তু বালুর ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। জেলে যাওয়ার পরেও অনেক দিন বালুকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হয়নি। পরে ‘পরিবারের অনুরোধে’ মন্ত্রিত্ব থেকে সরানো হয় জ্যোতিপ্রিয়কে।

    জেলমুক্তির পরে পার্থের মতো ‘একঘরে’ হয়ে যাননি বালু। মন্ত্রিত্ব না থাকলেও বিধায়ক ছিলেন। ফলে সক্রিয় রাজনীতিতেই ছিলেন তিনি। নিয়মিত যেতেন বিধানসভায়। মমতা যে তাঁকে দূরে ঠেলেননি, তা হাবেভাবে এবং কথায় বার বার বুঝিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী।

    বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলের টিকিট পাওয়ার তালিকায় জেলখাটা নেতারা থাকবেন কি না, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত বা দুর্নীতির অভিযোগে জেল খেটে আসা বিধায়কদের আর প্রার্থী করবে না তৃণমূল। সেই তালিকায় পার্থ-বালু ছাড়াও ছিলেন মানিক ভট্টাচার্য, জীবনকৃষ্ণ সাহার মতো নেতারা। জেল খাটতে না-হলেও শিক্ষা দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছিল প্রাক্তন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশ অধিকারীরও। তবে বালু যে আর পাঁচ জন নেতার মতো নন, তা বোঝা গিয়েছিল তিনি টিকিট পাওয়ায়। টিকিট পেয়েছিলেন পরেশও। তবে পরেশের হয়ে ভোটপ্রচারে দেখা যায়নি মমতাকে। কিন্তু বালুর হয়ে প্রচারে গিয়েছিলেন। তাঁর গ্রেফতারির নেপথ্যে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। জেল থেকে বেরিয়ে হাবড়ায় ‘সক্রিয়’ ছিলেন বালু। বারাসত সাংগঠনিক জেলায় তাঁকে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়েছিল তৃণমূল। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বারাসত সাংগঠনিক জেলার জন্য গঠিত কোর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় বালুকে।

    জেল থেকে বেরিয়ে রাজনীতির মূলস্রোতে ফিরেছিলেন বালু। সংগঠনের দায়িত্বও পেয়েছিলেন। ভোটেও লড়লেন। কিন্তু জিততে পারলেন না। ২৬ বছর পর এই প্রথম কোনও ভোটে হারলেন বালু।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)