স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে আবার জিতে গেলেন তিনি! সেই সাগরদিঘি আসনে এ বার তৃণমূলের টিকিটেও জয়ী হলেন বাইরন বিশ্বাস।
পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ আসনে হাওয়া যখন তৃণমূলের ‘প্রতিকূলে’, তখন মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি আসনে ৩৪,২৬০ ভোটে জয়ী হয়েছেন বাইরন। গত উপনির্বাচনের চেয়েও বেশি ব্যবধানে হারিয়েছেন বিজেপির তাপসকুমার চক্রবর্তীকে। বাইরনের অনুগামীরা মনে করেন, বরাবর সময়ে-অসময়ে স্থানীয়দের পাশে থেকেছেন তিনি। সেই ‘গুণই’ স্রোতের বিপরীতেও ভাসিয়ে রেখেছে বাইরনকে। ভোটের পরে ‘হারবেন’ মন্তব্য করেও তাই শেষ হাসি হাসলেন সেই বিশ্বাস, যাঁকে কংগ্রেস ছাড়ার পরে ‘বিশ্বাস-ঘাতক’ বলেছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে সাগরদিঘি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে লড়েছিলেন বাইরন। তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ২২,৯৮০ ভোটে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। সেই জয় সহজ ছিল না। রাজ্যে ২০১১ সালে পালাবদলের সময় থেকেই সাগরদিঘি ধারাবাহিক ভাবে তৃণমূলের পাশে থেকেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও ওই কেন্দ্র থেকে ৫০ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের সুব্রত সাহা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান সুব্রত। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাগরদিঘির উপনির্বাচনে বাইরনের জয় দিয়ে বিধানসভায় খাতা খোলে কংগ্রেস। তবে ফলপ্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তৃণমূলে চলে যান। যদিও বিধানসভার নথিতে বাইরন ছিলেন কংগ্রেসেরই বিধায়ক।
২০২৩ সালে মে মাসে তৃণমূলের ‘নবজোয়ার যাত্রা’র মধ্যেই পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলের যোগ দেন বাইরন। অভিষেক বলেছিলেন, বাইরনই মুর্শিদাবাদে বিজেপি-বিরোধী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবেন। বাইরন বলেছিলেন, ‘‘দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে কথা হয়নি। অভিষেকদাকে খুব ভাল লেগেছে। অভিষেকদা আমাকে সম্মান দিয়েছেন। মর্যাদা দিয়েছেন।’’
তৃণমূলে বাইরন যোগদান করেছিলেন আদতে ২০১৫ সালে। সে সময় মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু অধিকারীকে পর্যবেক্ষক করে পাঠিয়েছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। শুভেন্দুর হাত ধরেই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করেছিলেন বাইরন। তাঁর বাবা ব্যবসায়ী বাবর আলি বিশ্বাস যদিও কংগ্রেসেই থেকে গিয়েছিলেন। এখনও তিনি কংগ্রেসেই আছেন। মুর্শিদাবাদে তৃণমূলকর্মীদের একাংশের অভিযোগ ছিল, কংগ্রেস ছেড়ে এলেও তেমন সক্রিয় হতে দেখা যায়নি বাইরনকে। তবে তিনি বরাবর সমাজসেবা করে গিয়েছেন বলে মেনে নেন সাগরদিঘি থেকে বাইরনের জন্মভূমি শমসেরগঞ্জের বহু মানুষ।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি-তে যান। তার পরে তৃণমূলে থাকলেও বাইরন আরও ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে পড়েছিলেন বলে কর্মীদের একাংশের অভিযোগ। তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছিল মুর্শিদাবাদ তৃণমূলের একটা অংশকে। ২০২৩ সালে সাগরদিঘি উপনির্বাচনে বাইরনকে টিকিট দেয়নি তৃণমূল। বদলে টিকিট দেওয়া হয় দেবাশিসকে। তার পরেই বাইরন তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীরের কাছে গিয়ে সাগরদিঘি বিধানসভায় উপনির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিট চান। টিকিট পান। জেতেন। কিন্তু আবার তৃণমূলে ফিরে যান।
তৃণমূলে যোগ দেওয়ার কয়েক মাস পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিধায়ক বাইরনে বাড়ি ও তাঁর পরিবারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে টানা ১৯ ঘণ্টা তল্লাশি চালায় আয়কর বিভাগ। বাইরন জানান, তাঁর বাড়ি থেকে ৬০ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বলেন, “আমাদের একাধিক স্কুল, হাসপাতাল, চায়ের কারখানা, বিড়ি কোম্পানি রয়েছে। কাজেই বহু ক্ষেত্রে নগদ টাকার ব্যবহার হয়। কয়েকশো কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের জন্য খরচ আছে। পারিবারিক খরচও রয়েছে। কাজেই আটক (বাজেয়াপ্ত) ৬০ লক্ষ টাকা হিসাব-বহির্ভূত নয়। আমার সরকারি নথিপত্রের কিছু কপিও আয়করের আধিকারিকেরা নিয়ে গিয়েছেন। আর কিছুই মেলেনি এই তল্লাশিতে।’’ ওই অভিযানের মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালেও ভর্তি করানো হয়েছিল বাইরনকে। পরের বছর, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের সঙ্গে বিধায়ক বাইরনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। জাকিরের তৈরি নির্বাচনী কমিটি ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন বাইরন। তা নিয়ে কটাক্ষ করেছিল বিজেপি এবং কংগ্রেস। জাকিরের সঙ্গে বাইরনের সংঘাতের শুরু অবশ্য অনেক আগে। বিড়ি ব্যবসায় দু’জনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তার আঁচ ছড়ায় রাজনীতির ময়দানেও।
কবিতাপ্রেমী ঠাকুমা রোম্যান্টিক যুগের ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রনের নামে নাম রেখেছিলেন নাতির। মুর্শিদাবাদীয় উচ্চারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘য়’ উচ্চারিত হয় ‘ই’-র মতো। ফলে ‘বায়রন’ হয়ে যায় ‘বাইরন’। বিড়ি, চা, রাসায়নিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো একাধিক ব্যবসা রয়েছে বাইরনের। বিধানসভা ভোটে মনোনয়নের হলফনামা অনুযায়ী ২০২০-’২১ অর্থবর্ষে বাইরনের আয় ছিল ৩৯,৯২,১৭০ টাকা। ২০২৪-’২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯১,৬৯,৬৯২ টাকা। বাইরন হলফনামায় জানিয়েছেন, তিনি ব্যবসায়ী। সেটাই তাঁর আয়ের উৎস।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার আগে সকলকে চমকিত করে বাইরন জানান, তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছেন। জানিয়ে দেন, অধীরই তাঁর ‘গুরুদেব’। এমনও বলেন যে, সাগরদিঘিতে তিনি হারছেন। হারছেন আশপাশের আরও কয়েকটি আসনের তৃণমূল প্রার্থীরাও। তবে পরে আবার সেই বক্তব্য নিজেই খন্ডন করেন। তবে ধুলিয়ানের বুথে নিজের ভোটটাই দিতে পারেননি বাইরন। অভিযোগ, তিনি ভোট দিতে গেলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা বাধা দেন। শেষপর্যন্ত ভোট না দিয়েই ফিরে যেতে হয় তাঁকে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ভোট দিতে বুথে পৌঁছোন বাইরন। তাই তাঁকে ভোটদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তৃণমূলের সুরেই কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বাইরন।
প্রথম দফার ভোটের পরে নিজে হারছেন দাবি করলেও শেষপর্যন্ত শেষ হাসি হাসলেন বাইরনই। সাগরদিঘিতে বিজেপির প্রার্থীকে হারিয়ে দিলেন প্রায় ৩৪ হাজারেরও বেশি ভোটে। ধরে রাখলেন নিজের সাগরদিঘি কেন্দ্র। এ বার তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে।