এসআইআরে হয়রানির ঘটনার নীচে মমতা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধী ক্ষোভ! জনতা মানল না
আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভূমিধস বিজয়ের পথে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। এমনকি, খাস কলকাতায় শাসকদলের গ়ড়েও একের পর এক আঘাত হেনেছে বিজেপি। অনেকেই মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের এই ফলাফলের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রয়েছে এসআইআর-এর।
২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে প্রথম থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এসআইআর। তৃণমূল এবং বিজেপি— উভয়পক্ষই নির্বাচনী প্রচারে এসআইআর-কে ‘হাতিয়ার’ করেছিল। এই প্রক্রিয়ার জন্য বহু মানুষকে নথিপত্র হাতে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তালিকা থেকে ভোটারের সংখ্যা অনেক কমেছে। আবার নাম বাদ পড়ার ভয়ে দূরদূরান্ত থেকে শুধু ভোট দিতে রাজ্যে ফিরেছেন পরিযায়ী শ্রমিক এবং ভিন্রাজ্যে কর্মরতরা। দু’দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে প্রায় ৯৩ শতাংশ, যা দেশের সর্বকালীন সর্বোচ্চ।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই দাবি করে এসেছিল, কোনও যোগ্য ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না। তবে তৃণমূলের প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে ‘যোগ্য’ ভোটারদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলেছিল তারা। পক্ষান্তরে, বিজেপির দাবি ছিল, পশ্চিমবঙ্গে ‘স্বচ্ছ’ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এসআইআর-এর ছাঁকনির প্রয়োজন। ভোটার তালিকার এই ‘শুদ্ধিকরণ’ অবৈধ ভোটারদের মুছে দিয়েছে। গণনার পর অঙ্ক বলছে বিজেপির হিসাবই মিলে গেল।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর শুরু হয়েছিল ৪ নভেম্বর থেকে। তার আগে রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭.৬৬ কোটি। ১৬ ডিসেম্বর যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, তাতে ৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ যায়। মূলত মৃত, নিরুদ্দেশ, স্থানান্তরিত ভোটারের নাম সেই তালিকায় ছিল। এর পরে শুরু হয় এসআইআর-এর শুনানি প্রক্রিয়া। কাটছাঁট করে ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন তালিকা প্রকাশ করে কমিশন। খসড়া থেকেও বাদ পড়ে আরও ৫.৪৬ লক্ষ নাম। ফেব্রুয়ারির শেষে কমিশনের নথিতে যোগ্য ভোটার হিসাবে নিশ্চিত ছিলেন ৬.৪৪ কোটি মানুষ। তবে সেই সঙ্গে ৬০ লক্ষাধিক নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় ঝুলেও ছিল। এঁদের ভোটাধিকার রয়েছে কি না, কমিশন তখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।
বিবেচনাধীন নামগুলির নিষ্পত্তি নিয়ে রাজ্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশন— উভয়ের ভূমিকাতেই অসন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই নিষ্পত্তির দায়িত্ব তুলে দেয় কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের হাতে। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে তিনি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের এসআইআর-এর কাজে নিয়োগ করেন। তাঁরাই নথিপত্র যাচাই করে নামগুলি বিবেচনা করেছেন এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন। বিবেচনাধীন তালিকা থেকেও যাঁদের নাম বাদ গিয়েছিল, তাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত সেই ট্রাইবুনাল যোগ্য ভোটার হিসাবে যাঁদের ছাড় দেবে, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ়’ হয়ে গেলেও ট্রাইবুনাল থেকে ছাড় পাওয়া ভোটারদের বাধা দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছিল শীর্ষ আদালত।
শেষমেশ ১৫০০-রও কম আবেদনকারী ট্রাইবুনাল থেকে ভোটাধিকার পান। বাকিরা ভোটই দিতে পারেননি! তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে ‘হাতিয়ার’ করেছিল তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস। ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তির বিষয়টি আদালতের উপরেই ছেড়েছিল কমিশন।
এসআইআর-পরবর্তী নির্বাচনে অভিনব চিত্র দেখা গিয়েছে এ রাজ্যে। ভোটারের সংখ্যা কমলেও ভোটদাতার সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়ে গিয়েছে অনেকটা। দু’দফা মিলিয়ে গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৫১ লক্ষ ভোটার এ বার কম ছিল। প্রথম দফার ১৫২টি আসনে ১৭ লক্ষ ভোটার কমেছিল। কিন্তু ভোটদানের পরিমাণ বেড়েছিল ২১ লক্ষ। দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনে ভোটার কমেছিল ৩৪ লক্ষ। কিন্তু ভোটদানের পরিমাণ বেড়েছিল সাড়ে ৯ লক্ষ। অর্থাৎ, দু’দফা মিলিয়ে ভোটার কমেছে ৫১ লক্ষ। কিন্তু ভোটদানের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ লক্ষ।
মোট ভোটার কমে গেলে এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ ভোট দিলে সাধারণ হিসাবেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট সেখানেই থামেনি। ভোটের হার সর্বভারতীয় নজির গড়ে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ১২টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একসঙ্গে এসআইআর হয়েছে। সর্বত্রই অনেক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। কিন্তু এ রাজ্যের মতো এত ভোটের হার কোথাও দেখা যায়নি। পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল, নানা কারণে যাঁরা ভোট দিতেন না বা নানা কারণে ভোট দিতে পারতেন না, তাঁদের অনেকেই এ বার ভোট দিয়েছেন। প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ১০ হাজার ভোট বেশি পড়েছে। অনেকে মনে করছেন, ফারাক গড়ে দিয়েছে এই বাড়তি ভোটই। এসআইআর-কে বিজেপির বিরুদ্ধে যে ভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন মমতা, মানুষ তা মানেননি। দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা ছাপিয়ে গিয়েছে এসআইআর-এর হয়রানিকেও।