• ঘরের মেয়ে ঘরেই হারল! ‘মেজবোন’ নন্দীগ্রামের পর ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও হার শুভেন্দুর কাছেই, এ বার বড় ব্যবধানে
    আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
  • তিনি ভবানীপুরের ঘরের মেয়ে। অথচ সেই নিজের ঘরেই হারতে হল তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন মমতা। পরাস্ত হয়েছিলেন। এ বার মমতারই আসনে মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। তাতে পরাস্ত হলেন তৃণমূলনেত্রী। ঘরের মেয়েকে হারতে হল ঘরেই।

    নিজের আসন ভবানীপুরকে ‘বড়বোন’ এবং নন্দীগ্রামকে ‘মেজবোন’ বলে সম্বোধন করেন মমতা। ‘মেজবোনের’ কাছে পাঁচ বছর আগেই হেরেছিলেন। সে বারও হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এ বার ‘বড়বোন’ ভবানীপুরেও হারলেন তিনি। এ বারও হারালেন সেই শুভেন্দুই। গত বারের চেয়ে আরও বড় ব্যবধানে। নন্দীগ্রাম আসনে পাঁচ বছর আগে ১৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এ বার জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ালেন শুভেন্দু— ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়।

    ভবানীপুর আসনের ফল ঘোষণার আগেই নন্দীগ্রামের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। নন্দীগ্রামে আগেই বিজয়ী ঘোষিত হয়েছেন। এ বার ভবানীপুর আসনও জিতে নিলেন বিরোধী দলনেতা। মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে তাঁরই আসনে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, তাতে এ বার সাফল্য পেলেন শুভেন্দু। মমতাকে হারালেন মমতারই আসনে। ভবানীপুর আসনে জয়ের সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে শুভেন্দু বলেন, “যাঁরা হিন্দুত্বের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, এই জয় তাঁদের প্রতি উৎসর্গ করলাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো খুব দরকার ছিল। এ বার
    তাঁর রাজনৈতিক সন্ন্যাস হয়ে গিয়েছে।”

    সোমবার গণনাপর্বের শুরু থেকে ছিল টানটান উত্তেজনা। লড়াই যে হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে, সেই আভাস মিলেছিল সকাল থেকেই। ২০ রাউন্ডের গণনা — প্রথম রাউন্ড থেকেই শুরু হয়েছিল স্নায়ুর লড়াই। প্রথম রাউন্ডে মমতা এগিয়ে, তো দ্বিতীয় রাউন্ডে শুভেন্দু, তার পরের রাউন্ডে আবার এগিয়ে মমতা। প্রথম দিকের কয়েকটি রাউন্ড চলে এ ভাবেই। তার পরে পঞ্চদশ রাউন্ড পর্যন্ত টানা এগিয়ে ছিলেন মমতা। যদিও সপ্তম রাউন্ড থেকে টানা নিজের ভোট বৃদ্ধি করতে থাকেন শুভেন্দু। কমাতে থাকেন ব্যবধান। প্রতি রাউন্ডে একটু একটু করে ব্যবধান কমিয়ে ষোড়শ রাউন্ডে গিয়ে মমতাকে ছাপিয়ে যান তিনি।

    সকালে শুভেন্দু বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নিজাম প্যালেসে নিজের দলীয় অফিসে। পরে সেখান থেকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে যান। ভবানীপুরের জনবিন্যাসের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু তখনই জানিয়েছিলেন, প্রথম দিকের কিছু রাউন্ডে পিছিয়ে থাকলেও পরে তিনি এগিয়ে যাবেন। অন্য দিকে মমতা সকাল থেকে ছিলেন বাড়িতেই। গণনার প্রাথমিক আভাসে দলকে পিছিয়ে পড়তে দেখে তৃণমূলের প্রার্থী এবং কাউন্টিং এজেন্টদের উদ্দেশে সমাজমাধ্যমে বার্তাও দেন। এরই মধ্যে দুপুরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যান মমতা। দুপুরে গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যান শুভেন্দুও। দু’জনেই সন্ধ্যা পর্যন্ত গণনাকেন্দ্রেই ছিলেন। পর সন্ধ্যায় গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে কালীঘাটের বাড়িতে ফিরে যান তৃণমূলনেত্রী।

    এরই মধ্যে ঈষৎ উত্তেজনার পরিস্থিতিও তৈরি হয় গণনাকেন্দ্রের কাছে। দুপুরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের অদূরে একটি পেট্রল পাম্পে বসেছিলেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা। পুলিশ গিয়ে তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই উল্টো দিক থেকে বিজেপির একদল কর্মী-সমর্থক সে দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদেরও বাঁধা দেন পুলিশকর্মীরা। বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা তৃণমূলের পেতে রাখা চেয়ার ভাঙচুর করে বলেও অভিযোগ। এই উত্তেজনার মাঝেই দুপুর সাড়ে ৩টের কিছু পরে মমতা পৌঁছোন গণনাকেন্দ্র। ওই সময়ে তাঁর উদ্দেশে ‘চোর চোর’ স্লোগান তোলেন বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা।

    দুপুর থেকে মমতা এবং শুভেন্দু উভয়েই ছিলেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে। সন্ধ্যায় কয়েক রাউন্ড গণনা বাকি থাকতেই আচমকা গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে আসেন মমতা। ক্ষুব্ধ মমতা বলেন, “আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। পুরোটা একতরফা। ধাক্কা দিয়েছে, মেরেছে। সিআরপিএফ-এর সামনে। আমি প্রার্থী, আমাকে ঢুকতে দেয়নি। এটা হচ্ছে দানবিক পার্টি। ১০০টারও বেশি সিট লুট করেছে। এই নির্বাচন কমিশন হল বিজেপি কমিশন।” এ বিষয়ে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ অগ্রবালের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে দাবি তৃণমূলনেত্রীর।

    তৃণমূলনেত্রী আরও বলেন, “এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।”

    মমতা-শুভেন্দুর দ্বৈরথের প্রথম পর্ব ছিল নন্দীগ্রাম। ভবানীপুর দ্বিতীয় পর্ব। অনেকটা জেদ করেই ভবানীপুরে লড়তে চেয়েছিলেন শুভেন্দু। নিজের জেতা আসন নন্দীগ্রামে তো তিনি লড়েছেনই। ভবানীপুর ছিল তাঁর কাছে ‘রাজনৈতিক সুযোগ’ নেওয়ার শামিল। নন্দীগ্রামের পরে যদি ভবানীপুরে মমতাকে হারাতে পারেন, তা হলে তাঁর পালকে আরেকটি পালক উঠবে। হেরে গেলে দ্বৈরথের ফলাফল ১-১ থাকবে। স্বভাবতই সারা রাজ্যের নজর ছিল ভবানীপুরের দিকে।

    প্রার্থিতালিকা ঘোষণার পর থেকে গত দেড় মাস ধরে রাজ্য রাজনীতিতে ভবানীপুর আলাদা গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। ভবানীপুর আসনের জন্য শুভেন্দুর মনোনয়ন পর্বে সঙ্গী হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং। এমনকি, ভবানীপুরবাসীর জন্য পৃথক ইস্তাহারও প্রকাশ করেছিলেন শুভেন্দু। প্রচার পর্বের শুরুর দিকে ভবানীপুরে বিশেষ সময় দিতে পারেননি মমতা। কারণ, তাঁকে সারা রাজ্যে ঘুরে ঘুরে বাকি আসনের জন্য প্রচার করতে হয়েছিল। শেষবেলায় ভবানীপুরের প্রচারে নেমে মমতা পদযাত্রা করেছেন, জনসভা করেছেন, আবাসনে আবাসনে ঘুরে ছোট ছোট সভাও করেছেন। সবমিলিয়ে ভবানীপুরে মোট সাতটি জনসভা (যার মধ্যে মাইক-সংঘাতে চক্রবে়ড়িয়ার সভা কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে গিয়েছিল) এবং ছ’টি পদযাত্রা করেছেন মমতা। ভবানীপুরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনা করেছেন। অন্য দিকে, ভবানীপুরে শুভেন্দুও করেছেন ১০টি সভা, তিনটি মিছিল এবং একটি রোড শো। পাশাপাশি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগও করেছিলেন বিরোধী দলনেতা।

    বিজেপির লক্ষ্য ছিল, ভবানীপুরেও নন্দীগ্রামের পুনরাবৃত্তি। অন্যদিকে, তৃণমূলের লক্ষ্য ছিল, দলনেত্রীর আসনকে কলকাতার ‘ফার্স্ট বয়’ করা। সেই উত্তাপ যেমন প্রচার পর্বে টের পাওয়া গিয়েছে, তেমনই টের পাওয়া গিয়েছে ভোটের দিনও। চেনা ‘ছক’ ভেঙে সকাল থেকে বুথে বুথে ঘুরেছেন মমতা। ঘুরেছেন শুভেন্দুও। এই লড়াইয়ে উভয়পক্ষকেই কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) পরবর্তী পরিস্থিতি। এসআইআর পর্বে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বাদ গিয়েছিল ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম। এ বারের নির্বাচনে সেটিও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল। ধরে নেওয়া যেতে পারে সেই তালিকায় নির্দিষ্ট কোনও একটি দলের ভোটার ছিলেন না।

    ভোটার সংখ্যায় সেই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত কোন দলকে সুবিধা করে দিল, তা গণনার আগে পর্যন্ত স্পষ্ট ছিল না। কারণ ভবানীপুরের জনবিন্যাস। এখানে যেমন রয়েছেন বিভিন্ন ধর্মের ভোটার, তেমনই রয়েছেন বিভিন্ন ভাষাভাষী ভোটারও। মমতা নিজেও প্রায়শই ভবানীপুরকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলে থাকেন। বহুত্ববাদী চরিত্রের এই আসনে রয়েছে মোট আটটি ওয়ার্ড— ৬৩, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৭ এবং ৮২। জনবিন্যাসের নিরিখে ভবানীপুরে প্রায় ২৪ শতাংশ মুসলিমের বাস। বাকি ৭৬ শতাংশ অমুসলিম, যার মধ্যে অন্য সংখ্যালঘুরাও রয়েছেন। শিখ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে।

    ওই ৭৬ শতাংশ অমুসলিমের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বাংলাভাষী। বাকি ৩৪ শতাংশ অবাঙালি (গুজরাতি, পঞ্জাবি, মাড়োয়ারি, বিহারি এবং ওড়িয়া)। ভবানীপুরের ৭২ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ড বাঙালি অধ্যুষিত। ৬৩, ৭০, ৭১, ৭৩ এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে আবার দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করছেন গুজরাতি, পঞ্জাবি এবং মাড়োয়ারিরা। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা সংখ্যায় অধিক।

    ভবানীপুরে রয়েছে আর্থসামাজিক বিন্যাসও। উচ্চবিত্তদের মধ্যে বেশির ভাগই অবাঙালি ব্যবসায়ী। উচ্চমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তদের মধ্যে রয়েছেন বাঙালিরা। আর্থিক দিক থেকে তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে-থাকা বস্তিবাসীরাও রয়েছেন এই কেন্দ্রে। গোটা কেন্দ্র জুড়েই রয়েছে মিশ্র জনবিন্যাস। ফলে ভবানীপুরে একটিই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটব্যাঙ্কের প্রভাব রয়েছে, তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)