২০২১ সালে প্রথম বার নির্বাচনে লড়াই। বিপক্ষে ছিলেন ব্যারাকপুরের ‘বাহুবলী’ বিজেপি নেতা মণীশ শুক্লের বাবা চন্দ্রমণি শুক্ল। তবে রাজের আসল প্রতিপক্ষ নাকি ছিলেন অর্জুন সিংহ। অর্জুন ততদিনে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন। প্রথম বার ভোটের ময়দানে রাজ। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সেইসঙ্গে ‘বাহুবলী’দের দাপট এড়িয়ে তৃণমূলের ভরা সময়ে ব্যারাকপুর জয়ী হন রাজ। এ বার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কৌস্তুভ বাগচী। প্রথম জীবনে কংগ্রেসি রাজনীতি করা কৌস্তুভ বিজেপিতে যোগ দেন দু’বছর আগে। এ বার কমল-ঝড়ে রাজকে ময়দানের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন ব্যারাকপুর কোর্টের আইনজীবী কৌস্তুভ।
২০২১ সালে নির্বাচনের আগে রীতিমতো ব্যারাকপুরেই পড়ে ছিলেন রাজ। হালিশহরে পরিচালকের পৈতৃক বাড়ি। গোটা নির্বাচন জুড়ে সেখান থেকেই যাতায়াত করেছেন কেন্দ্রে। প্রথম বার রাজের ব্যারাকপুর দখল যে খুব সহজ ছিল, তেমন নয়। অর্ধেকের বেশি অবাঙালি ভোটার, তাও আবার বেশির ভাগ শ্রমিক। সমান পরিমাণ রয়েছেন বাঙালি ও মুসলিম ভোটার। সে বার তৃণমূল থেকে যখন রাজের নাম ঘোষণা করা হয়, তার আগেই ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক শীলভদ্র দত্ত বিজেপিতে নাম লেখান। স্বাভাবিক ভাবেই সেই সময় ব্যারাকপুরে একটা শূন্যতা তৈরি হয়। ব্যারাকপুরের হাওয়ায় ভাসছিল, বিধায়ক হতে পারেন ব্যারাকপুর পুরসভার চেয়্যারম্যান উত্তম দাস। কিন্তু দল বেছে নেয় রাজকে। ততদিনে অবশ্য তৃণমূলের অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। অনেকেই ভেবেছিলেন রাজের বিপক্ষে লড়বেন উত্তম। কিন্তু সেই সময় যেন কৌশলী রাজ উত্তমের কাঁধে ভরসা করেই গোটা নির্বাচনী প্রচারটা সারেন।
এ দিকে, চন্দ্রমণি শুক্লকে সামনে রেখে বিজেপিও আবেগের রাজনীতি খেলার কৌশল নিয়েছিল। চন্দ্রমণির বাবা একদা সিপিএমের ‘বাহুবলী’, পরে তৃণমূলের ছাত্রনেতা এবং তার পরে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মণীশ শুক্ল নিহত হন। টিটাগড় থানার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় তাঁকে। স্বাভাবিক ভাবে সেই আবেগের উপর ভরসা করেই যেন কিছুটা ভোট বৈতরণী পার করতে চেয়েছিল বিজেপি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও হয় দু’পক্ষের। সে বার প্রায় ৯ হাজারেরর বেশি ভোটে জয়ী হন রাজ।
প্রথম বার তৃণমূলকে ব্যারাকপুর জেতানোর পুরস্কারও নাকি পান রাজ। ২০২৬-এর নির্বাচনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থা ছিল রাজেই। সে ভাবে ভোটের ময়দানে লড়ার অভিজ্ঞতা নেই বিজেপি প্রার্থী কৌস্তুভের। এক বার পুরভোটে দাঁড়ালেও বিপুল ভাবে হারেন। সে দিক থেকে কৌস্তুভের প্রথম বড় নির্বাচন। তিন বছর আগে মাথা কামিয়ে ফেলেন কৌস্তুভ। প্রতিজ্ঞা করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর গদি থেকে না সরানো পর্যন্ত মাথায় চুল রাখবেন না। ফল ঘোষণার দিন প্রথম রাউন্ডে প্রায় ১৭০০-এর বেশি ভোটে এগিয়ে যাওয়ার পরে তিনি বলেন, ‘‘এ বার আমি চুল রাখব। কারণ মুখ্যমন্ত্রী বদল হচ্ছে।’’
সপ্তম রাউন্ডের পর থেকে চিত্রটা স্পষ্ট হতে শুরু করে। ১৩ হাজার ৩৪৭ ভোটে এগিয়ে থাকতে দেখা যায় কৌস্তুভকে। যদিও নবম রাউন্ডের পর ব্যবধান কমিয়ে ৭ হাজারে নামিয়ে আনেন রাজ। ১৫তম রাউন্ড থেকে ফের ব্যবধান বাড়ে। তার পরেই কৌস্তুভের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
তবে ফল ঘোষণার দিনটা হারের পাশাপাশি অপ্রিয় অভিজ্ঞতাও হল রাজের। সকালে সাদা শার্ট ও জিন্স পরে গণনা কেন্দ্রে যান রাজ। পঞ্চম রাউন্ডের পরে যখন কৌস্তুভ ১০ হাজার মতো ব্যবধান বাড়িয়ে নিয়েছেন, সেই সময় গণনা কেন্দ্র ছেড়ে বেরোন রাজ। অভিযোগ, সেই সময়েই তাঁর শার্টে গোবর ছোড়ে কিছু লোক। তাঁর বিরুদ্ধে ‘চোর চোর’ স্লোগানও নাকি দেওয়া হয়েছে সেই সময়। এমনিতেই ঠান্ডা মাথার মানুষ বলে পরিচিত রাজ চক্রবর্তী। এ দিনও ওই ঘটনার পরেও নীরবেই গণনা কেন্দ্র ছাড়েন রাজ।
ব্যারাকপুরের সঙ্গে প্রায় ছয় বছরের যোগাযোগ রাজের অভিনেত্রী স্ত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়েরও। বার কয়েক স্বামীর হয়ে প্রচারে এসেও শেষরক্ষা হল না।