• মমতার অস্ত্রেই মমতাকে হারালেন শুভেন্দুরা? সঙ্গত করল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা?
    এই সময় | ০৫ মে ২০২৬
  • এক দিকে স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি করা অস্ত্রকেই হাতিয়ার। এই দুইয়ের উপর ভর করেই বঙ্গজয় করে ফেলল বিজেপি।

    ভোট পর্বের শুরু থেকেই বিজেপি দাবি করে এসেছে, গোটা রাজ্য জুড়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ‘আন্ডারকারেন্ট’ বইছে। নির্বিঘ্নে, সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন হলে ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন দেখা যাবে। পাল্টা এসআইআর-এ সাধারণ মানুষের হেনস্থা হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে বিজেপির দাবির মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিল তৃণমূল। পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কথাও ভোটের প্রচারে তুলে ধরেছিল তারা। কিন্তু শেষমেশ বিজেপির দাবিই যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর তা-ই স্পষ্ট হলো।

    তবে শুধু তৃণমূল জমানায় ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ বা আইনশৃঙ্খলার ‘অবনতি’র বিষয়টি তুলে ধরে প্রচারই নয়, দলীয় সংকল্পপত্রে (ইস্তেহার)-ও বিস্তর চমক দিয়েছিল বিজেপি। মমতার সরকার যত রকম বা যে পরিমাণ ভাতা চালু করেছিল এত দিনে, তার কয়েক গুণ ভাতা তথা আর্থিক সহায়তার কথা নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষণা করে তারা। এমন কোনও ক্ষেত্র নেই, যেখানে বিজেপি ভাতার ঘোষণা করেনি। মহিলা, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবার, অঙ্গনওয়াড়ি-আশাকর্মী, পড়ুয়া, ব্যবসায়ী, চুক্তিভিক্তিক শিক্ষক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী, এমনকি সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জন্যেও কিছু না কিছু ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

    ১৫ দফার ‘সংকল্পপত্র’ প্রকাশ করেছিল বিজেপি। তাতে এক দিকে যেমন দুর্নীতি, অপশাসন, সিন্ডিকেট-রাজ, অনুপ্রবেশের মতো বিষয়কে সামনে রেখে তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে, তেমনই উন্নয়নের রূপরেখার কথা বলা হয়েছে। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে ভাতা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছেন মহিলারা। বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গকেও। বিজেপির সংকল্প পত্রে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার ঘোষণাও ছিল। বিজেপির ইস্তেহারে বলা হয়, মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসের পয়লা থেকে ৫ তারিখের মধ্যে তাঁদের অ্যাকাউন্টে তিন হাজার টাকা দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের মহিলাদের জন্য গর্ভবতী থাকাকালীন ২১ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং ৬টি পুষ্টি সরঞ্জাম দেওয়া হবে।

    এ ছাড়াও অবিবাহিত ছাত্রীদের স্নাতক স্তরে ভর্তির আগে এককালীন ৫০ হাজার টাকা (‘কন্যাশ্রী’র পাল্টা) দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে বিজেপি। পাশাপাশি সরকারি পরিবহণে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা থাকবে। মহিলাদের সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। মমতার তথাকথিত ‘মাস্টারস্ট্রোক’কে এই সব ঘোষণা ম্লান করে দিয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। সংকল্পপত্র প্রকাশের সময়ে শাহ বলেছিলেন, ‘বাঙালি নববর্ষের দিন সংকল্পের সঙ্গে আমাদের প্রচারের যাত্রা শুরু হবে। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের দুঃস্বপ্ন ঘুচবে। আগামী পাঁচ বছরে বিজেপি সরকার এ রাজ্যে বিকাশের রাস্তা খুলবে। মমতা দিদি ভয়, ভ্রষ্টাচার প্রতিস্থাপিত করেছেন। এটা আইনের শাসনের ভরসা। রোজগারের ভরসা। সোনার বাংলা তৈরি করব আমরা। আমার বিশ্বাস, বাংলার জনতা আমাদের এখানে পাঁচ বছরের জন্য সরকার তৈরির সুযোগ দেবেন। আমরা সেই ভরসার ভিত্তিতেই রাজ্যের পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করব।’

    বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের মত, মানুষ যে কতটা ক্ষিপ্ত ছিলেন তৃণমূল সরকারের উপর, তা এই ফলাফল থেকেই স্পষ্ট। তবে শুধু ক্ষোভ নয়, সাধারণ মানুষ বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করেছেন। সেই ভরসার জায়গা তৈরিও হয়েছে তৃণমূলের প্রতি ‘ঘোর অবিশ্বাস’ থেকেই। যদিও মমতা বলেন, ‘এটা অনৈতিক জয়। নট মরাল ভিক্ট্রি।’

  • Link to this news (এই সময়)