• পানিহাটিতে জিতলেন আরজি করে নির্যাতিতার মা! ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় তদন্তের খাতা নতুন করে খুলবে কি?
    আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
  • পানিহাটিতে ২৮,৮৩৬ ভোটে জিতে গেলেন আরজি কর হাসপাতালে নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা। বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর জয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবার তৃণমূলের হাতছাড়া হল এই কেন্দ্র।

    পানিহাটিতে প্রচার করতে এসেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রার্থীকে পাশে নিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ৪ মে ভোটে জেতার পর এ রাজ্যে নারী নির্যাতনের ‘ফাইল’ নতুন করে খোলা হবে। আরজি করে ধর্ষণ-খুনের ঘটনার তদন্তের খাতাও নতুন করে খুলতে পারে, ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। পানিহাটিতে বিজেপি প্রার্থী জেতার পর সেই সম্ভাবনা আরও জোরালো হল বলে মনে করা হচ্ছে। আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যে বহু মানুষ পথে নেমেছিলেন। পানিহাটি, সোদপুর ‘রাতদখল’-এর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই ভোট নির্যাতিতার মায়ের পক্ষেই গেল।

    প্রায় তিন দশক ধরে পানিহাটিতে ক্ষমতায় ছিল ঘোষ পরিবার। নির্মল ঘোষ প্রথম এই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের টিকিটে। পরে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন এবং আবার জেতেন। ২০০৬ সালের ভোটে তিনি অবশ্য গদিচ্যুত হয়েছিলেন। ২০১১ সালে ‘পরিবর্তনের হাওয়া’য় আবার জেতেন। সেই থেকে পর পর তিন বার নির্মল পানিহাটির বিধায়ক ছিলেন। বিধানসভায় ছিলেন তৃণমূলের মুখ্য সচেতক। এ বার তাঁর পুত্র তীর্থঙ্করকে টিকিট দিয়ে ঘোষ পরিবারের উপরেই আস্থা রেখেছিল তৃণমূল। ক্ষমতার ধারা একই পরিবারে দশকের পর দশক ধরে কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে পানিহাটিতে ক্ষোভ রয়েছে বলে বিরোধীদের একাংশের দাবি ছিল। তবে তার পাল্টা যুক্তিও ছিল। শাসকদলের একাংশের বক্তব্য ছিল, ১৯৬৭ সাল থেকে এই কেন্দ্রে মোট সাত বার বিধায়ক হয়েছেন সিপিএমের গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। ফলে রাজনৈতিক ইতিহাসই বলে দিচ্ছে, ‘ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনে’ পানিহাটির বাসিন্দাদের আপত্তি নেই। বাস্তবে দেখা গেল, ২০২৬-এ ফের ‘পরিবর্তনের হাওয়া’য় ভেসে গিয়েছে তৃণমূল। সেই হাওয়াতেই জিতলেন নির্যাতিতার মা-ও।

    আরজি কর হাসপাতালের নির্যাতিতা চিকিৎসকের মায়ের নাম পানিহাটির প্রার্থী হিসাবে বিজেপি ঘোষণা করার পর এই কেন্দ্র আলাদা করে আলোচনায় উঠে আসে। ওই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত সঞ্জয় রায় এখন জেলে। আদালত তাঁকে আজীবন কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছে। আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদে রাজ্য জুড়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যে আবেগে ভর করে দলমতনির্বিশেষে গভীর রাতেও পথে নেমেছিল নাগরিক সমাজ। সেই আবেগকেই ভোটে কাজে লাগাতে চেয়েছে বিজেপি। নির্যাতিতার মায়ের সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। তবে অনেকে তাঁকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছিলেন। তৃণমূল এবং সিপিএম সমর্থকদের একাংশের অভিযোগ, মেয়ের মৃত্যুকে রাজনীতির আঙিনায় টেনে এনে ভোটে ফায়দা তোলার চেষ্টা করেছিলেন পানিহাটির পদ্মপ্রার্থী। সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর বিজেপি-যোগ। প্রার্থী নিজে অবশ্য দাবি করেছিলেন, মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার পেতে তিনি ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভোটে জিতে মেয়েদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চান। আরজি কর পর্বে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন পানিহাটির বিদায়ী বিধায়ক নির্মলও। নির্যাতিতার দেহ সৎকারের সময় শ্মশানে তাঁর বিরুদ্ধে ‘অতি সক্রিয়তা’র অভিযোগ তুলেছিলেন কেউ কেউ। নির্মলকে সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদও করে সিবিআই।

    পানিহাটি কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থীও প্রথম থেকেই চর্চায়। তৃণমূলের মতো বামেরাও এ বার সেখানে তারুণ্যে আস্থা রেখেছে। আরজি কর আন্দোলনের ‘মুখ’ ছিলেন দলের যুবনেতা কলতান দাশগুপ্ত। দলীয় পতাকা নিয়ে বা না-নিয়ে একাধিক বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। রাতদখলের অন্যতম আয়োজক ছিলেন। জেলেও গিয়েছিলেন। নির্যাতিতার মায়ের অভিযোগ, তাঁর মেয়ের মৃত্যুকে রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে গিয়ে কলতানেরা ‘প্রাসঙ্গিক’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন। বিজেপির ভোট কেটে তৃণমূলকে জিতিয়ে দেওয়াই তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। পাল্টা সিপিএমের যুক্তি ছিল, যে সিবিআই তদন্তে নির্যাতিতার পরিবার আস্থা রাখতে পারেনি, ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি, সেই সিবিআই একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কী ভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন পানিহাটির প্রার্থী? প্রশ্ন তুলেছিলেন কলতানেরা। সেই প্রশ্নের ভিত্তিতে পুরনো ভোটব্যাঙ্ক ফিরিয়ে আনতে এই কেন্দ্রের সামগ্রিক প্রচারেও এ বার সিপিএম বাড়তি জোর দিয়েছিল। তবে তাতে জয় এল না।

    পানিহাটি পুরসভার ২৯টি ওয়ার্ড নিয়ে পানিহাটি বিধানসভা। পরিসংখ্যান বলছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে সেখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ২.৩০ লক্ষ। ভোট পড়েছিল ৭৫.৫৬ শতাংশ। ২৫ হাজার ভোটে সে বার জিতেছিলেন নির্মল। তিনি ৮৬,৪৯৫টি ভোট (৪৯.৬১ শতাংশ) পেয়েছিলেন। ৬১ হাজারের বেশি ভোট (৩৫.১৭ শতাংশ) পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন কংগ্রেস থেকে বিজেপি-তে যোগ দেওয়া প্রার্থী সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী তাপস মজুমদার পানিহাটিতে ২১ হাজার (১২.১৪ শতাংশ) ভোট পেয়েছিলেন। ২,৩৩৪টি ভোট পড়েছিল নোটা-য়। দমদম লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পানিহাটিতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৭৪.৪১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। বিজয়ী তৃণমূল প্রার্থী সৌগত রায় ১২ হাজারের বেশি জিতেছিলেন। পেয়েছিলেন প্রায় ৭২ হাজার ভোট। বিজেপি প্রার্থী শীলভদ্র দত্ত ৫৯ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। সিপিএম প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী পেয়েছিলেন ৩৫ হাজার ভোট। নোটা-য় ভোট পড়েছিল ১,৫৬২টি।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)