পরিবর্তনের বাংলায় নওশাদ ভাইজানেই আস্থা ভাঙড়ের, আসন বদলে গোহারা শওকত
প্রতিদিন | ০৫ মে ২০২৬
তিনি ভাঙড়ের ভাইজান। বিধায়কের আসনে পাঁচ বছর ধরে আসিন। তা সত্ত্বেও আর পাঁচজন নেতার মতো সম্পত্তির পরিমাণ লাফিয়ে বাড়েনি তাঁর। বরং শাসকদলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বেড়েছে মামলার সংখ্যা। বিধায়ক হিসেবে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে প্রায় সাড়ে চারশো প্রশ্ন করেছেন। বিলাসবহুল জীবনযাপন না বেছে প্রাধান্য দিয়েছেন এলাকার উন্নয়নে। আর তাই ছাব্বিশেও সেই ভাইজানকেই ভোটবাক্সে ভালোবাসায় ভরাল ভাঙড়বাসী। একুশের পর পরিবর্তনের বাংলাতেও নিজের গড় সফলভাবে ধরে রাখলেন নওশাদ সিদ্দিকি।
বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কেন্দ্র ভাঙড়। একুশে সবুজ ঝড়ের মাঝেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই একটি মাত্র আসন হাতছাড়া হয়েছিল তৃণমূলের। রাজনীতির ময়দানে নেমেই শাসকদলকে টেক্কা দিয়েছিলেন পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকি। ছাব্বিশেও ভাঙড় আইএসএফেরই থাকবে বলে আত্মবিশ্বাসী ছিল দল। গণনার সকালেও ডবল ডিজিট আসন জিতবেন বলে জানিয়েছিলেন নওশাদ। গণনার শুরুতে পিছিয়ে পড়লেও বেলা গড়াতেই দেখা গেল, ডবল ডিজিট না ছুঁলেও নিজের গড় নিজের দখলেই রাখলেন নওশাদ। দীর্ঘদিনের চেনা মাটিতে দাঁতও ফোটাতে পারলেন না শওকত মোল্লা।
ভাঙড়ের নির্বাচনী যুদ্ধ বরাবরই বেশ জমজমাট। ২০০৬ সালে সিপিএমের ‘রাজত্বে’ও তৃণমূলের ‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলাম ভাঙড়ের লাল-দুর্গ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও ২০১১ সালে পালাবদলের সময় এই কেন্দ্রের দখল নেন সিপিএমের বাদল জমাদার। এরপর ২০১৬ সালে সিপিএম জমানার দাপুটে মন্ত্রী ‘চাষার ব্যাটা’ আবদুর রেজ্জাক মোল্লা তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন। একুশে ভাঙড়ের রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত বদল আসে। তৃণমূল-বিজেপি বা সিপিএম নয়, ভাঙড়ের মানুষ ভরসা করেন ‘ঘরের ছেলে’ আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকিকে। তৃণমূলের বাঘা নেতা রেজাউল করিমকে পরাজিত করেন তিনি।
ছাব্বিশের ভোটমুখী ভাঙড়ে মূল মাথাব্যথা ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানের অভাব। এই ইস্যুকে হাতিয়ার করেই ব্যাট চালিয়েছেন নওশাদ। এদিকে ভাঙড় পুনরুদ্ধারে মরিয়া তৃণমূলও। সেই কারণেই কার্যত শওকত মোল্লাকে তুরুপের তাস করেছিল ঘাসফুল শিবির। কঠিন লড়াই জানা সত্ত্বেও ক্যানিং পূর্ব আসন থেকে সরিয়ে এনে তাঁকে প্রার্থী করেছিল ভাঙড়ে। গণনার শুরুর দিকে মনে করা হচ্ছিল, একেবারে ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল। প্রথম কয়েক রাউন্ডে এগিয়ে ছিলেন শওকত। কিন্তু বেলা গড়াতেই বদলে গেল ছবিটা। যতটা সময় এগিয়েছে, জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছেন ভাইজান। ভাঙড় দখল তো হলই না, উলটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আরও বেশ কয়েকটি জেতা আসনও হাতছাড়া হল তৃণমূলের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্ষেত্রে শওকতের হারের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর ভাবমূর্তি। বছরের পর বছর ওই এলাকায় অশান্তির পিছনে উঠে এসেছে তাঁর নাম। ভোটবঙ্গে ভাইরাল হওয়া ‘মাছ চোর’ গানেই যেন ধরা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের খতিয়ান। বিজেপির ঝড় ওঠা বাংলায় তাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিজেপিকে বিশ্বাস করতে না পারলেও শওকতকেও ভরসা করতে পারল না। সেই কারণেই জয়ের মুকুট উঠেছে নওশাদের মাথায়। তবে শুধু ভাঙড় নয়, মিনাখাঁ আসনেও জয় পেয়েছেন আইএসএফ প্রার্থী।