নামে সন্দেশ থাকলেও সন্দেশখালির জল-বাতাসে নুনের আধিক্যই বেশি। বছর দুয়েক আগে সেই নোনা জলেই লেগেছিল রাজনীতির ঢেউ। যা তছনছ করে দিয়ে গেল তৃণমূলের দেড় দশকের নোনাধরা সাম্রাজ্য। একইসঙ্গে সন্দেশখালির নোনা জলে প্রথমবার ফুটল পদ্ম। তৃণমূল প্রার্থী ঝর্না সর্দারকে বিপুল ভোটে হারিয়ে জয়ী হলেন সনৎ সরদার।
সন্দেশখালি বিধানসভা এককালে ছিল সিপিএমের শক্ত গড়। ২০১১ সালে গোটা রাজ্যে পালাবদল হলেও অপরিবর্তিত ছিল সন্দেশখালি। ২০১৬ সালে তৃণমূলমুখী হয় সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত বিধানসভা। ২০২১ সালেও বড় ব্যবধানে জয়ী হন তৃণমূলের বিধায়ক সুকুমার মাহাতো। কিন্তু তাল কেটেছিল ২০২৪-এ। সামান্য চাষ, নদীর মিন ধরে জীবিকা চালানো খেটে খাওয়া মানুষগুলির রুজি রুটিতে ভাগ বসায় ‘হাঙরে’র দল। তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের মস্তানি নাভিশ্বাস তুলেছিল এলাকার মানুষের। জমি দখল, বাঁধ কেটে চাষের জমিতে নোনাজল ঢুকিয়ে ভেড়ি তৈরি, মহিলাদের নির্যাতনের মতো একের পর এক অভিযোগ ওঠে শাহাজানের বিরুদ্ধে। ফুঁসে ওঠেন এলাকার মানুষ। সন্দেশখালির বিদ্রোহ নাড়িয়ে দেয় বাংলা তথা গোটা দেশকে। শাহজাহানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয় খোদ কেন্দ্রীয় এজেন্সিও।
শেষবেলায় সন্দেশখালির ‘মস্তান’ শাহজাহানের বিরুদ্ধে তৃণমূল পদক্ষেপ করলেও বিশেষ ফল হয়নি। সন্দেশখালিকে হাতিয়ার করে গোটা বাংলায় তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে সরব হন খোদ নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা। ২৪-এর লোকসভা ভোটেই সন্দেশখালি রায় দিয়ে দিয়েছিল। সন্দেশখালি বিধানসভা সেবার প্রচুর লিড দিয়েছিল বিজেপিকে। হাওয়া খারাপ বুঝে এবারের ভোটে সুকুমার মাহাতোকে সরিয়ে ঝর্নাকে প্রার্থী করে তৃণমূল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ভোট গণনার শুরুতে তৃণমূল কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ৮-৯ রাউন্ডের পর তৃণমূলকে পিছনে ফেলে উঠে আসেন বিজেপি প্রার্থী সনৎ সরদার। ভোটের ফলাফল বলছে, সন্দেশখালিতে বিজেপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ১,০৭,১৮৯টি। অন্যদিকে তৃণমূল পেয়েছে ৮৯,৬৭৯। তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছেন সিপিএম প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ মাহাতো। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১২,৯২১। অর্থাৎ, ১৭,৫১০ ভোটে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে জয়ী বিজেপি। সন্দেশখালির পরিবর্তনের ঘূর্ণি আছড়ে পড়েছে গোটা রাজ্যেও। কমিশনের রিপোর্ট বলছে, পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এবার বাংলায় ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিজেপি। শেষ পাওয়া খবরে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে ২০৫ আসনে। অন্যদিকে তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে মাত্র ৮৩ আসনে।
সন্দেশখালির পাশাপাশি তৃণমূলকে ছুড়ে ফেলেছে পাশের বিধানসভা কেন্দ্র হিঙ্গলগঞ্জও। সন্দেশখালি কাণ্ডে শাহজাহানের বিরুদ্ধে প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন যে মহিলা তিনি রেখা পাত্র। সন্দেশখালি বিধানসভা তফসিলি উপজাতি প্রার্থীর জন্য সংরক্ষিত হওয়ায় তফসিলি রেখাকে টিকিট দেওয়া হয়েছিল হিঙ্গলগঞ্জে। এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী আনন্দ সরকারকে প্রায় ৫ হাজার ভোটে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন রেখা পাত্র।