• চা বলয়ের রং গেরুয়া, কোন সমীকরণে তরাই-ডুয়ার্সে বাড়ল বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক?
    প্রতিদিন | ০৫ মে ২০২৬
  • একদিকে আরএসএস ম্যাজিক। অন্যদিকে ন্যূনতম মজুরি এবং জমির পাট্টা নিয়ে টালবাহানা। তৃণমূলের অন্দরের চোরাস্রোতে হড়পা বানে উত্তরের তরাই-ডুয়ার্সের চা বলয়ে বিধ্বস্ত তৃণমূল কংগ্রেস! গড় শুধু ধরে রাখাই নয়, বিপুল ভোটে জয়ী বিজেপি। সবুজ চা বলয়ের রাজনৈতিক রং কার্যত এই মুহূর্তে গেরুয়া। একাধিক রাজনৈতিক সমীকরণ, বিমল গুরুংয়ের প্রচার, গোর্খা ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে রেখে বিজেপি জয়ের ব্যবধান বাড়ানো হল।

    শিলিগুড়ি মহকুমার গ্রামীণ এলাকা এবং আলিপুরদুয়ার জেলা ও জলপাইগুড়ির মালবাজার মহকুমা, ধূপগুড়ি ব্লক নিয়ে ডুয়ার্সের চা বলয়। এখানে রয়েছে ১৯০টি চা বাগান অধ্যুষিত বীরপাড়া-মাদারিহাট, কালচিনি, কুমারগ্রাম, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা, নাগরাকাটা, মালবাজার, দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি, ফাসিদেওয়া বিধানসভা কেন্দ্র। বরাবর ওই আসনগুলোতে ভোটের ফলাফলে নির্ণায়কের ভূমিকা নিয়ে থাকে চা শ্রমিকদের ভোট। এর মধ্যে  মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি ও ফাসিদেওয়া বিধানসভা তরাই অঞ্চলের। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৪৫টি চা বাগান রয়েছে। দার্জিলিং পাহাড়ে জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত ৮৭টি চা বাগান রয়েছে। 

    ওই চা বাগানের শ্রমিকেরা তিনটি বিধানসভা আসনের ভাগ্য নির্ধারক। ওই কারণে এবারও নির্বাচনে এখানে অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার, ন্যূনতম মজুরি, জমির অধিকার, আবাসন। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে ডুয়ার্স, তরাই এবং দার্জিলিং পাহাড়ে পুরোপুরি চা বাগান নির্ভর ১২টি বিধানসভা আসন ঘরে তুলেছিল গেরুয়া শিবির। পরবর্তীতে চা বাগানের বুথগুলিতে শক্তিবৃদ্ধি করে তৃণমূল। মাদারিহাট বিধানসভা উপ নির্বাচনে চা বাগানের একশো বুথের মধ্যে ৮১টিতে জয়ী হয় তৃণমূল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election Result 2026) জয়ের ওই সাফল্য ধরে রাখতে মরিয়া তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি কুমারগ্রাম, কালচিনি, মাদারিহাট, ফালাকাটা, নাগরাকাটা ও মালবাজার বিধানসভা কেন্দ্রের চা বাগান এলাকার বুথগুলিতে অনেক আগে থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়। ওই ছয়টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৪৮৩টি বুথ রয়েছে। 

    ২০১৯ লোকসভা ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছে ওই ৪৮৩টি বুথের মধ্যে ১৫টিতে তৃণমূলের জয় এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালে ২৪৪ বুথে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। রাজনৈতিক মহলের মতে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল দেখে তৃণমূল নেতৃত্ব সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন চা বলয়কে উপেক্ষা করে ডুয়ার্স এবং তরাই এলাকায় বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফলাফল সম্ভব নয়। এরপরই সুপরিকল্পিত ভাবে পুরোপুরি বামেদের ধাচে জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রের ৭৮টি এবং আলিপুরদুয়ার জেলার ৬৭টি চা বাগানে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের ইউনিট কমিটি গঠন করা হয়। একই কৌশল নেওয়া হয়েছে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের অধীন বিশেষত তরাই এলাকার চা বাগানগুলোতে। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে চা বলয়ের ভোটব্যাঙ্ক ফেরাতে ওই ইউনিট কমিটিগুলো সক্রিয় ভূমিকা নিতে গেরুয়া ভোট ব্যাঙ্ক ফাঁকা হয়। 

    কিন্তু সেই কৌশল কাজে লাগেনি। পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকে চা বাগানের মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ঘর গোছানোর কাজ চালিয়ে গিয়েছে আরএসএস। তার উপর প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জন বার্লার তৃণমূলে চলে যাওয়াটা যেন শাপে বর হয়েছে গেরুয়া শিবিরের। কারণ, জন বার্লাকে ঘিরে শ্রমিক মহলে ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছিল। সেটা ঝেড়ে ফেলে আরএসএস চা বাগানের জমি পর্যটন শিল্প বিকাশের অছিলায় বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে, ন্যূনতম মজুরি এবং যতটা জমিতে শ্রমিক পরিবার বসবাস করছে সেটার পাট্টার দাবিতে জনমত গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যায়। বলয়ের ১২টি আসনেই জয়ী বিজেপি।

    মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মন জানান, চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানা চালিয়েছে তৃণমূল সরকার। শিলিগুড়ির নির্বাচনী জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, নিষ্ঠুর তৃণমূল সরকার চা বাগানগুলোও ধ্বংস করে দিচ্ছে। আনন্দময়বাবু বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস এবং আমাদের সাংগঠনিক শক্তি জয় এনে দিয়েছে।” তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য এখনই পরাজয়ের কারণ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। দলে সাধারণ সম্পাদক মৃদুল গোস্বামী বলেন, “পর্যালোচনার পর যা বলার বলা হবে।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)