নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরেরও ‘নায়ক’, কীভাবে ছাব্বিশে বঙ্গজয়ের ‘বাজিগর’ শুভেন্দু?
প্রতিদিন | ০৫ মে ২০২৬
বাংলা শেষ রাজনৈতিক বদল দেখেছিল ২০১১ সালে, সাড়ে তিন দশকের বাম জমানা অবসানে। ঠিক ১৫ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বঙ্গভূমে – ফের পরিবর্তন। ছাব্বিশের ভোটে ঘাসফুলের জমিতে ফুটল পদ্ম। নতুন ইতিহাস তৈরি করে প্রথমবার বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এল। কোন ম্যাজিকে একুশে মাত্র ৭৭ থেকে ছাব্বিশে প্রায় ২০০-এ লাফিয়ে উঠে গেল গেরুয়া শিবির, তা নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। তবে এহেন সাফল্যের নেপথ্যে একজনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিঃসন্দেহে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সেই ২০২০ সালে যে তৃণমূল শিবির ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন বিজেপিতে, সেই দলেই নিজের জমি তৈরি করেছেন, বিশ্বাসযোগ্যতা আর দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। আর দীর্ঘ এই সংগ্রামের সুফল আজ পেলেন তিনি এবং তাঁর দল। তাই আজ বিজেপির বঙ্গজয়ের ‘বাজিগর’ অবশ্যই কাঁথির ‘শান্তিকুঞ্জে’র দ্বিতীয় পুত্র। ছাব্বিশের ভোটপরীক্ষায় অবশ্য শুভেন্দুর নিজের ‘রেজাল্ট’ও দুর্দান্ত! জোড়া কেন্দ্রে জয়! নন্দীগ্রাম থেকে ৯ হাজার ভোটে এবং ভবানীপুর থেকে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ‘অপ্রতিরোধ্য’ অধিকারী পরিবারের এই সদস্য।
বাবার হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ শুভেন্দুর। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সূত্র ধরে দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করেছেন। বিধায়ক, সাংসদ থেকে একাধিক দপ্তরের মন্ত্রিত্ব সামলেছেন। ৫৫ বছরের শুভেন্দুর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা নেহাৎ কম নয়। কিন্তু এরপরই কোনও কারণে তাঁর সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব বাড়ে এবং শেষমেশ শিবির ছেড়ে নতুন করে কেরিয়ার তৈরি করেন পদ্ম ব্রিগেডে। সেটা ছিল ২০২০ সাল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠেন শুভেন্দু। তারপর থেকে বঙ্গ বিজেপির ভার ধীরে ধীরে শুভেন্দুর হাতে সঁপে দেয় দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে বাংলার বিরোধী দলনেতার আসনে বসার পর সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। আর ছাব্বিশের জোড়া জয়ের স্বাদ পেলেন শুভেন্দু (Suvendu Adhikari)।
সেই থেকে বাংলার মাটিতে লাগাতার সুযোগ্য বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক শিশির অধিকারীর মেজো ছেলে। কখনও কখনও বিক্ষোভের মুখে পড়লে তাঁকে বাবার নাম নিয়েই কটু কথা শুনতে হয়েছে। স্লোগান উঠেছে – ‘চোর চোর চোরটা/শিশিরবাবুর ছেলেটা’। সব মুখ বুজে সয়েছেন। শুধুমাত্র আন্দোলনের জমি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। যখন যেখানে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা হামলার মুখে পড়েছেন, ছুটে গিয়েছেন শুভেন্দু। বিধানসভায় বারবার সরকার-বিরোধী প্রশ্ন তোলায় তাঁকে সাসপেনশনের মুখে পড়তে হয়েছে। গত ৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ অধিবেশনের শেষে শুভেন্দুর সাসপেনশন প্রায় রুটিনে পরিণত হয়েছিল। দমেননি তিনি। এটুকু বেশ বোঝাই যায়, লড়াই-আন্দোলন জারি রাখার সুশিক্ষাটি তিনি গ্রহণ করেছেন প্রাক্তন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে।
তবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের কেরিয়ার আরও উজ্জ্বল করতে শুভেন্দুর নিজস্ব সংযোজন – হিন্দুত্বের প্রচার। নন্দীগ্রাম-সহ গোটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ঘরে ঘরে হিন্দুধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার পুনর্জাগরণ করেছেন। ভোটের আগে তো সেখানে প্রায় নির্দেশের মতো ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর কথা। শুভেন্দু বলেছিলেন, ”প্রত্যেক হিন্দু ঘরে ধ্বজ লাগাতে হবে। জেহাদিদের থেকে আমাদের আলাদা হতে হবে। ওদের সঙ্গে কোনও সংযোগ থাকবে না।” শুধু এখানেই নয়, বিরোধী দলনেতা হওয়ার সুবাদে শুভেন্দুর হিন্দুত্ব-বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মেরুকরণের রাজনীতিতে সফল হয়েছেন তিনি। আর তার সুফল বঙ্গের গেরুয়া ব্রিগেড ঘরে তুলল আজ, ৪ মে। বাংলার ইতিহাসে প্রথমবার সরকার গড়ল বিজেপি।