• বাঙালির মাছপ্রেম থেকে বঙ্গ সংস্কৃতি, মোদি-শাহর বিজেপির বঙ্গায়নই মাস্টারস্ট্রোক শমীকের
    প্রতিদিন | ০৫ মে ২০২৬
  • বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি অস্মিতা আপাতত রাজনীতির তুরুপের তাস। সেই তাস কে, কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেটাই মুন্সিয়ানা। তাতে প্রথম দফায় বিজেপি স্টার মার্ক নিয়ে পাশ করেছে, তা বলতেই হয়। বাংলার সঙ্গে বিজেপির দূরত্ব মুছে তথাকথিত ‘গোবলয়ে’র দলকে বাঙালিয়ানায় জারিত করে তবেই বঙ্গ বিজয়ে সক্ষম হল গেরুয়া শিবির। বিজেপির এই বঙ্গীকরণের নেপথ্য নায়ক যিনি, তাঁর নাম শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতি। এই অসম্ভবকে সম্ভব করা শমীকের প্রশংসা দিকে দিকে। অনেকে আবার প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে তাঁর তুলনা করছেন। সেই তুলনায় না গিয়েও বলা যায়, শমীক অন্তত বঙ্গ বিজেপিকে অনেকটা নতুন আঙ্গিকে বাংলার মাটিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

    শমীক ভট্টাচার্য নিজে একজন বিদগ্ধ, সংস্কৃতিবান মানুষ। মূল ধারার রাজনীতির আগে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই সম্ভবত নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার ভাব তিনি আত্তীকরণ করেছেন। এরপর বিজেপিতে যোগ দিয়ে কেরিয়ার শুরু করার পর কম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। ২০২৫ সালে শমীক রাজ্য বিজেপির সভাপতি হন। তারপর থেকে ‘গোবলয়ের দল’ তকমাটি বিজেপির গা থেকে ঝেড়ে ফেলতে সক্রিয় হয়েছেন। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে সেই কাজটি করার বিশেষ সময়-সুযোগ পাননি। তবু যেটুকু পেয়েছেন, তাতেই ম্যাজিক ঘটিয়ে ফেলেছেন! বিজেপির বঙ্গজয়ের নেপথ্যে একজন যদি হন শুভেন্দু অধিকারী, আরেকজন নিঃসন্দেহে শমীক ভট্টাচার্য।

    কী এমন করলেন শমীক, যাতে বিজেপিকে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতটা আপন করে নিল বঙ্গবাসী? এমনি তো আর ম্যাজিক ফিগার ছাড়িয়ে দু’শো পেরোয়নি গেরুয়া শিবির, জনগণমনের অধিনায়ক হয়েই এই পারফরম্যান্স। মোদি-শাহকে শমীক বারবার বুঝিয়েছেন, বাঙালিয়ানা বাংলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তা এড়িয়ে বঙ্গে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শমীক বুঝিয়েছেন, কথায় কথায় বাঙালি মনীষীদের রেফারেন্স দিতে হলে তাঁদের ভালোভাবে জানা দরকার। শমীক এও বুঝিয়েছেন, বাঙালি মানেই ‘দা’ অথবা ‘বাবু’ নয়। মোদির মুখ ফসকে বলে ফেলা ‘বঙ্কিমদা’র ড্যামেজ কন্ট্রোলে বাইরে যতটা একা লড়েছেন শমীক, অন্দরে ততটা যত্ন নিয়েই দিল্লির নেতাদের শিখিয়েছেন বাংলার ইতিহাস। আবার রাজা রামমোহন রায়কে ‘ব্রিটিশদের দালাল’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে যখন তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন মধ্যপ্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিংহ পারমার, তখনও নির্দ্বিধায় তাঁর সমালোচনা করেন শমীক। এখানেই শেষ নয়, বিরোধীদের তৈরি করা মিথ ভাঙতে নিজের রান্নাঘরের ছবিটা তুলে ধরে বুঝিয়েছেন, খাঁটি বাঙালির মতো তিনিও মাছপ্রেমী।    

    এই যে ঘনঘন মোদি-শাহ এসেছেন প্রচারে, তাতে সদা-সর্বদা সঙ্গী ছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। কখনও তিনি মোদির হাতে তুলে দিয়েছেন বাঙালি মনীষীদের ছবি, কখনও দিয়েছেন কবি-সাহিত্যিকদের ছবি, কখনও বাঙালির ‘ম্যাটিনি আইডল’ উত্তম কুমারের ছবি। বাঙালি অস্মিতায় শান দিতে এর চেয়ে বড় বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ আর কী-ই বা হতে পারত? বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের বিরোধিতায় তৃণমূল কংগ্রেস যতটা বাঙালি আবেগকে রাজনীতির ময়দানে এনে ফেলেছিল, তেমন প্রকাশ্য প্রতিবাদের চেয়ে শমীকের সযত্নে এধরনের পাঠদান ঢের কার্যকরী হয়েছে। তার হাতেগরম প্রমাণ ছাব্বিশে বিজেপির বঙ্গ বিজয়। তাই রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীককে একশোয় দু’শো দেওয়া অস্বাভাবিক নয় হয়তো।
  • Link to this news (প্রতিদিন)