• মতুয়া বলয়ে নিজেদের পরিধি আরও প্রসারিত করল বিজেপি! জেতা আসন ধরে রাখার সঙ্গে দখল করল তৃণমূলের ঘরও
    আনন্দবাজার | ০৪ মে ২০২৬
  • রাজ্য রাজনীতিতে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলালেও মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে আড়াআড়ি বিভাজন রয়েই গেল। এ বারের নির্বাচনেও মতুয়া ভোটের উপর তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়েরই ‘দখলদারি’ স্পষ্ট। আরও স্পষ্ট হল মতুয়া ভোটব্যাঙ্কের দুই পৃথক বলয়। একটি বনগাঁ-রানাঘাটের ‘মতুয়া বলয়’, যেখানে দৃশ্যত একার দাপট দেখাল বিজেপি। অন্যটি সুন্দরবনাঞ্চলের ‘মতুয়া বলয়’। শাসন ক্ষমতা হারালেও সুন্দরবনাঞ্চলের এই আসনগুলি ধরে রাখল তৃণমূলই।

    ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে হাতছাড়া হওয়া বাগদা আসন এ বার পুনরুদ্ধার করেছে বিজেপি। গত বিধানসভা ভোটে এই আসনটি বিজেপিই জিতেছিল। উপনির্বাচনের সেই ধাক্কা কাটিয়ে বাগদা ফের নিজেদের দখলে নিল বিজেপি। উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া প্রভাবিত অপর এক বিধানসভা কেন্দ্র সন্দেশখালিও তৃণমূলের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। এ বার হিঙ্গলগঞ্জ থেকে বিজেপি প্রার্থী করেছিল শেখ শাহজাহান-বিরোধী তৎকালীন বিক্ষোভের অন্যতম ‘মুখ’ রেখা পাত্রকে। অন্য দিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবা আসনটিও তৃণমূলের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। মতুয়া প্রভাবিত এই আসনটি গত দেড় দশক ধরে তৃণমূলের দখলেই ছিল। এ বার সেখান থেকেও কয়েকটি দখল করে নিল বিজেপি। এই আসনগুলি ছাড়া মতুয়া প্রভাবিত অন্য বিধানসভা আসনগুলিতে ক্ষমতার বিন্যাস যেমন ছিল, তেমনই রয়েছে।

    মতুয়াগড় ঠাকুরনগরে রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট। ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘জয় বাংলা’— দুই রাজনৈতিক ভাষ্যই রয়েছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে। এই বিভাজনের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে আছে গোটা পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সমাজেই। এক দিকে বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর এবং তাঁর অনুগামীরা। অন্য দিকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর এবং তাঁর অনুগামীরা।

    ঠাকুরবাড়ির যুযুধান দু’পক্ষের মধ্যে ভোটের লড়াই আরও প্রকট হয়েছে এ ই নির্বাচনে। সেই লড়াইয়ের অন্যতম উপকেন্দ্র ছিল বাগদা। ঠাকুরবাড়িরই দুই ‘মুখ’ নেমেছিল সম্মুখসমরে। এক দিকে মমতাবালার কন্যা, বিদায়ী বিধায়ক মধুপর্ণা ঠাকুর। তাঁর বিপরীতে শান্তনুর স্ত্রী সোমা ঠাকুর। ননদ-বৌদির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার মুখে হাসি ফোটে, তা নিয়ে শুরু থেকেই কৌতূহলী ছিল মতুয়া সমাজ। কারণ, গত বিধানসভা ভোটে বনগাঁ-রানাঘাটের ‘মতুয়া বলয়’ ছিল মূলত বিজেপির হাতেই।

    এ বারের নির্বাচনে মতুয়া ভোটের অভিমুখ অনেকাংশে আবর্তিত হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে। সেই প্রক্রিয়া ঘিরে উদ্বেগ দানা বেঁধেছিল মতুয়া সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া, ‘বিবেচনাধীন’ হিসাবে ঝুলে থাকা নিয়ে একাংশের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছিল। মতুয়াদের উদ্বেগ এবং চাপা অসন্তোষ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও যে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহদের নির্বাচনী প্রচার থেকেই স্পষ্ট ছিল।

    এসআইআর নিয়ে মতুয়াদের উদ্বেগকে ভোট ময়দানে ‘হাতিয়ার’ করেছিল তৃণমূলও। রাজ্যের শাসকদল বার বার বলেছে, যাঁদের নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদেরই এখন ভোটার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার জন্য লাইনে দাঁড় করানো হচ্ছে। মতুয়াদের সঙ্গে বিজেপি ‘প্রতারণা’ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছিল তৃণমূল।

    রাজ্যের তিন জেলার অন্তত ২৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফলের উপরে মতুয়া ভোটের সরাসরি প্রভাব আছে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার সাতটি আসন (যার পাঁচটি বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত), দক্ষিণ ২৪ পরগনার ন’টি আসন এবং নদিয়ার সাতটি আসন (যার পাঁচটি রানাঘাট লোকসভার অন্তর্গত এবং দু’টি বনগাঁ লোকসভার অন্তর্গত)। আসনগুলি হল বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, বাগদা, গাইঘাটা, স্বরূপনগর, মিনাখাঁ, হিঙ্গলগঞ্জ, গোসাবা, বাসন্তী, কুলতলি, জয়নগর, ক্যানিং পশ্চিম, মগরাহাট পূর্ব, মন্দিরবাজার, বারুইপুর পূর্ব, বিষ্ণুপুর, হরিনঘাটা, কল্যাণী, রানাঘাট উত্তর পশ্চিম, রানাঘাট উত্তর পূর্ব, রানাঘাট দক্ষিণ, কৃষ্ণগঞ্জ এবং শান্তিপুর। লোকসভা নির্বাচন হোক বা বিধানসভা ভোট, এই এলাকাগুলির মতুয়া ভোট কার পক্ষে গেল, তা ফলাফলের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

    ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের সময় থেকে মতুয়া প্রভাবিত আসনগুলির সিংহভাগের উপরে একচ্ছত্র অধিকার ছিল তৃণমূলের। তা প্রথম ধাক্কা খায় ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে। মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে শুরু করে বিজেপি। মতুয়া প্রভাবিত ২৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১১টিতে এগিয়ে যায় তারা। বাকি ১২টিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। ২০১৯ সালে যে দল যে আসনে এগিয়ে ছিল, গত বিধানসভা ভোটে সেই দলই সেখান থেকে জয়ী হয়েছিল। গত লোকসভা ভোটের সময়েও নিজেদের জেতা আসনগুলিতে এগিয়ে ছিল তৃণমূল-বিজেপি। পরে ২০২৪ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে বাগদা হাতছাড়া হয় বিজেপির।

    মতুয়া সমাজের ভোট কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত হয় ঠাকুরবাড়ি কেন্দ্র করে। ঠাকুরবাড়ির বড়মা প্রয়াত বীণাপানি দেবীর সঙ্গে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক ছিল। বীণাপানির দুই পুত্র কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর এবং মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর উভয়কেই সংসদীয় রাজনীতিতে এনেছিলেন মমতা। তবে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিজেপি-তে যোগ দেন মঞ্জুলকৃষ্ণ। ঠাকুরবাড়িতে রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকেই। এখন ঠাকুরবাড়ির দুই রাজনৈতিক শিবিরকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কপিলকৃষ্ণ-জায়া মমতাবালা এবং মঞ্জুলকৃষ্ণ-পুত্র শান্তনু। এ বারের নির্বাচনে মতুয়া প্রভাবিত আসনগুলির মধ্যে তাই অন্যতম উল্লেখ্যযোগ্য দু’টি আসন ছিল বাগদা এবং গাইঘাটা। বাগদায় বাড়তি নজর ছিল ঠাকুর পরিবারেরই দুই সদস্যের মুখোমুখি লড়াই হওয়ায়।

    গাইঘাটা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। তিনিও ঠাকুর পরিবারেরই সদস্য। সম্পর্কে শান্তনুর দাদা। ‘অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘ’-এর সঙ্ঘাধিপতিও তিনি। তাঁকে প্রার্থী করা নিয়ে দলের অন্দরেই একাংশের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছিল। ‘ঠাকুর পরিবারের প্রার্থী’ চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে নির্দল প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন বিজেপির স্থানীয় এক মণ্ডল সভাপতি তনিমা সেন। দল বোঝানোর পরে অবশ্য তনিমা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তবে ভোটের আগে দলের অন্দরে নীচুতলার এই অসন্তোষ অস্বস্তিতে ফেলেছিল বিজেপিকে। সেই গাইঘাটা আসনও শেষ পর্যন্ত নিজেদের দখলেই ধরে রাখল বিজেপি।

    গত বিধানসভা এবং লোকসভা ভোটে বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে যে দল যেখানে জিতেছিল বা এগিয়েছিল, এ বার সেই সেই এলাকায় দলগুলি মোটের উপর নিজেদের ‘শক্তি’ ধরে রেখেছে। শুধু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে। তৃণমূলের হাতে থাকা কিছু আসন জিতে নিয়েছে বিজেপি। ফলত, রাজ্যের দুই ‘মতুয়া-বলয়ে’ নিজেদের পরিধি আরও কিছুটা বিস্তৃত করল পদ্মশিবির। এখন এই পরিধি বিস্তার আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলে, সে দিকে নজর থাকবে।

    এ বারের নির্বাচনে উপনির্বাচনে হাতছাড়া হওয়া বাগদা আসন পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি হিঙ্গলগঞ্জ এবং গোসাবা তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। বাকি আসনগুলির মধ্যে যার হাতে যেটি ছিল, সেটি তার আসনেই রয়েছে। বারুইপূর্ব পূর্ব এবং স্বরূপনগর আসনের চূড়ান্ত ফল সোমবার রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। ওই দু’টি আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল।
  • Link to this news (আনন্দবাজার)