‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি, এতে রাম-রাবণ আছে/ দেখে যা নিজের চোখে, হনুমান কেমন নাচে...।’ না, ঝালমুড়ির ঝুড়ি নিয়ে মেলায় ঘুরে ঘুরে এমন গান কোন দিনই গাননি বিক্রমকুমার সাউ। কিন্তু কোন টানে যে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন, তা বোধহয় একমাত্র বজরংবলীই জানেন। সোমবার ভোট গণনার শেষে ঝাড়গ্রামের কলেজ মোড়ের টিটি মার্কেটে তাঁর দোকানে তিল ধারণের জায়গা নেই। সাধারণ ঝালমুড়ি পিয়াসীরা তো আছেনই, দলে দলে ভিড় জমিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী থেকে শুরু করে নেতা-কর্মীরা। এই দোকান যেন তাঁদের কাছে তীর্থক্ষেত্র। খোদ মোদী সারপ্রাইজ় ভিজ়িট করেছিলেন বলে কথা!
১৯ এপ্রিল ঝাড়গ্রাম স্টেডিয়াম থেকে জনসভা শেষ করে হেলিপ্যাডের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পথে শহরের কলেজ মোড়ে গাড়ি থেকে নেমে বিক্রমকুমার সাউয়ের দোকানে ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বীরভূমের মুরারইয়ে খান ক্রিকেট গ্রাউন্ডে জেলার দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে ভোট প্রচার করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঝালমুড়ি কেনাকে কটাক্ষ করে মুখ্য়মন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় বলেছিলেন: ‘১০ টাকা কখনও পকেটে থাকে ওঁর? কত নাটক। নির্বাচনের সময়ে গুহাতে গিয়ে বসে থাকেন। কখনও নির্বাচনের সময় বলেন আমি চাওয়ালা। ১০ টাকা বের করে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। সেটাও নিজেদের তৈরি করা। নয়তো দোকানে ক্যামেরা ফিট করা ছিল কী ভাবে?’ তার জবাবে চুপ করে থাকেননি মোদীও। কিছুটা কটাক্ষের সুরে বলেছিলেন, ‘আমি ঝালমুড়ি খেলাম। আর ঝাল লাগল তৃণমূলের।’
বাংলায় পনেরো বছরের তৃণমূল জমানার পতন হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও হয়নি ঠিকই। তবে দেওয়াল লিখনটা স্পষ্ট। কিছুক্ষণ আগেই ঝাড়গ্রাম কেন্দ্র থেকে লক্ষ্মীকান্ত সাউকে জয়ী ঘোষণা করেছে কমিশন। তার পরেই লক্ষ্মীকান্ত চলে গিয়েছেন বিক্রমের দোকানে। হাতে জয়ের সার্টিফিকেটটা পতাকার মতো পতপত করে উড়ছে। মুখে চওড়া হাসি। হাজার ভোল্টের আলো যেন ঝিকমিক করছে। দোকানে ঢুকেই নমস্কার করে বললেন, ‘বানান দাদা।’
এ দিন বিকেলে বিক্রম দোকানে বসেননি। শরীরটা খারাপ। তাঁর জায়গায় দোকান সামলাচ্ছেন বিক্রমের বাবা-মা। তাঁরাই হাত চালাতে শুরু করলেন। বাদাম, মুড়ি, মশলা, লঙ্কা… এক অপূর্ব গন্ধে তখন চারিদিক ম ম করছে। দশ টাকার ঝালমুড়ি কিনে লক্ষ্মীকান্ত নিজে খেলেন। সঙ্গে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিলিও করলেন। একেবারে মোদীর মতোই। এ সব দেখছেন আর মিটিমিটি হাসছেন বিক্রমের বাবা উত্তম সাউ এবং মা সুনীতা দেবী। আদতে তাঁরা বিহারের গয়ার বাসিন্দা। তবে গত ১৫ বছর ধরে ঝাড়গ্রামের মানুষ হয়ে গিয়েছেন।
ভোটের খবর তাঁরা জানেন। বাংলায় গেরুয়া ঝড় উঠেছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সময় পর্যন্ত ১৮২টি আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি। তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছে মাত্র ৬২টি আসন। রাত ৯.৩৯ মিনিটের পরিসংখ্যান এটাই। তবে এই সব রাজনৈতিক আকচাআকচির মধ্যে ঢুকতে চাইলেন না। তাঁদের মুখে শুধু ব্যাবসার শ্রীবৃদ্ধির কথা। সুনীতা মেনে নিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আসার পরে বিক্রি অনেক বেড়ে গিয়েছে। আগে হাফ বস্তা বিক্রি হতো। এখন দেড় বস্তা হয়।’ মানে বিক্রি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ।
বিজেপির লক্ষ্মীকান্ত অবশ্য চাঁচাছোলা। সোজাসুজি বলে দিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাওয়ায় তৃণমূলের খুব ঝাল লেগেছিল। এখন সাধারণ মানুষ ওদের রাজ্য থেকেই বিদায় করে দিয়েছে।’ বিক্রমের দোকানের সামনে বিজেপি কর্মী সমীর মাহাতো, অজয় রানারা গেরুয়া আবির মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ঝালমুড়ি কিনবেন। বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য সুখময় শতপথী তো বলেই দিলেন, ‘এক হাজার ঝালমুড়ির অর্ডার দিয়েছি। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলি করব।’ এমন ঘোষণায় কেউ কেউ যেন বলেও উঠলেন, ‘এ সুযোগ পাবে না আর, বল না ভাই কী দাম দেবে...।’ বিজেপির এই ঝালমুড়ি অবশ্য পুরো ফ্রি।